শ্রমিকের দাবিতে একমত, ভিন্নতা ‘তৃতীয় পক্ষের’ সম্পৃক্ততায়
নারায়ণগঞ্জে পোশাক শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মাসিক মজুরির দাবিতে চলমান আন্দোলন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা। কেউ মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকদের ধৈর্য ধরে সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন, কেউ দ্রুত নতুন মজুরিকাঠামো ঘোষণার দাবি তুলেছেন। আন্দোলনে ভাঙচুর ও সহিংসতার বিরোধিতা করলেও এর পেছনে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সংগঠনগুলোর নেতাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
শ্রমিক নেতাদের কেউ কেউ নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশের অভিযোগ করেছেন। অন্যরা বলছেন, তৃতীয় পক্ষের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা উচিত নয়। আবার কয়েকজন নেতা আন্দোলনের কিছু আচরণ ও স্লোগানকে সন্দেহজনক বলেও উল্লেখ করেছেন।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর শ্রমিক দলের আহ্বায়ক এস এম আসলাম বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে রাজপথে নামতে প্রভাবিত ও উসকানি দিচ্ছে। তার অভিযোগ, আন্দোলনের মধ্যে থেকে একটি পক্ষ অরাজকতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটাচ্ছে। তবে প্রকৃত শ্রমিকরা এসব ভাঙচুরে জড়িত নন বলে দাবি করেন তিনি।
সিদ্ধিরগঞ্জে শ্রমিক অসন্তোষ এড়াতে শ্রমিক দল বিভিন্ন কারখানার কর্মকর্তা ও নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেছে বলে জানান আসলাম। মজুরি বোর্ডের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করবেন বলে তারা প্রত্যাশা করেন। শ্রমিকরা যেন পরিবার নিয়ে ভালো থাকতে পারেন, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করা হবে বলে আশা তার।
অন্যদিকে, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের নারায়ণগঞ্জ মহানগর সভাপতি আব্দুল মোমিন শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে যৌক্তিক বলে মনে করেন। তার মতে, নিত্যপণ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ায় শ্রমিকদের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হয়েছে। তবে যে কর্মস্থল শ্রমিকদের জীবিকার উৎস, সেখানে ভাঙচুর বা হামলা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
আন্দোলন পরিস্থিতি তৈরির জন্য সরকারকে দায়ী করে মোমিন বলেন, শ্রমিকদের বিষয়টি সরকার যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। শ্রমিক ও পেশাজীবী নেতাদের সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করা হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। তৃতীয় পক্ষের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তিনি বলেন, এ নিয়ে সবার মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের শ্রমিক সংগঠনগুলোর ব্যবহৃত কিছু জায়গা বর্তমান সরকার-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার কারণে তাদের সঙ্গে সাবেক আওয়ামী লীগপন্থী শ্রমিকদের সমঝোতা তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
“বিভিন্ন সেক্টর, বিশেষ করে ঝুটসহ যেসব সেক্টরের সুবিধা বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগের শ্রমিক বা সংগঠনগুলো পেয়ে আসছিল, সেগুলো বর্তমান সরকারের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ব্যবহার করতেছে। তারা তাদের সাথে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে এই সাইডগুলো ব্যবহার করতেছে,” যোগ করেন তিনি।
জামায়াত সমর্থিত এ শ্রমিক সংগঠনের নেতা শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মজুরি বোর্ডের আশ্বাসে আপাতত ধৈর্য ধরার কথা বলেন। তবে তার মতে, বিষয়টি দীর্ঘায়িত না করে দ্রুত নতুন মজুরিকাঠামো ঘোষণা করা উচিত।
গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি সেলিম মাহমুদ বলেন, আন্দোলনের শুরুতে তাদের দাবি ছিল মজুরি বোর্ড গঠন করা। সেটি হওয়ায় এখন বোর্ডকে কার্যকর করে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো সেখানে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলনের পক্ষে থাকলেও কারখানায় হামলা ও ভাঙচুরের সমর্থন করেন না তারা।
আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রসঙ্গে সেলিম মাহমুদ বলেন, অতীতের বিভিন্ন শ্রমিক আন্দোলনেও ক্ষমতাসীন দলের বিপরীত পক্ষকে দায়ী করার প্রবণতা দেখা গেছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনে সবার সমর্থন থাকা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে শ্রমিক নেতা এম এ শাহিন মনে করেন, যথাসময়ে মজুরি বোর্ড গঠন করা হলে বর্তমান পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতে পারত। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী তিন বছর পরপর মজুরি পুনর্র্নিধারণের কথা থাকলেও গত মে মাসে বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পরে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আন্দোলনের পর বোর্ড গঠন করা হয়।
শাহিনের মতে, উত্তরায় শ্রমিকদের ওপর প্রশাসন ও পুলিশের চাপ এবং গাজীপুর ও আশুলিয়ায় শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়। ফতুল্লার শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমেছিলেন বলে মনে করেন তিনি। তবে আন্দোলনের মধ্যে কিছু আচরণ ও সিদ্ধান্ত তার কাছেও সন্দেহজনক মনে হয়েছে।
শাহিন বলেন, শ্রমিকদের মূল দাবি মজুরি বৃদ্ধি, চাকরির নিরাপত্তা ও রেশন। কিন্তু শিবু মার্কেট এলাকায় এসব দাবির বাইরে বিভিন্ন স্লোগান এবং সাইনবোর্ডে গিয়ে মহাসড়ক দখলের সিদ্ধান্ত দেখা গেছে। এসবের পেছনে কেউ কাজ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
মজুরি বোর্ড গঠনের পর এখন সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করা উচিত বলে মনে করেন শাহিন। তবে ঘোষিত মজুরি শ্রমিকদের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে তারা আবার নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে যাবেন। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ করে কারখানায় উৎপাদনের স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি নারায়ণগঞ্জ জেলার আহ্বায়ক আবদুল আল মামুন বলেন, ৩০ হাজার টাকার চেয়েও বেশি, অর্থাৎ ৩২ থেকে ৩৬ হাজার টাকা মজুরির দাবির প্রতি তাদের সমর্থন রয়েছে।
তবে ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শ্রমিকদের দায়ী করার আগে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হবে, যাতে বেতন বাড়ানোর পর নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় না কমে যায়।
জাতীয় শ্রমিক শক্তি নারায়ণগঞ্জ জেলার আহ্বায়ক ফয়সাল আহমেদ বলেন, ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবির প্রতি তাদের সমর্থন রয়েছে। তবে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য সাবেক ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, বিসিক শিল্পাঞ্চলের কিছু কারখানার শ্রমিকদের বিএনপির নামধারী নেতারা জিম্মি করে রেখেছেন এবং তাদের আন্দোলনে যোগ দিতে দিচ্ছেন না।





































