২৬ জুলাই ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২২:০৩, ২৫ জুলাই ২০২৬

৮ বছর খালি পড়ে আছে ৫৫ কোটির সিজেএম ভবন, কেন?

৮ বছর খালি পড়ে আছে ৫৫ কোটির সিজেএম ভবন, কেন?

৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে আট বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল আটতলা বিশিষ্ট চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) ভবন। নারায়ণগঞ্জ শহরের শায়েস্ত খাঁ সড়কের সুবিশাল এ সরকারি ভবনটিতে একদিনের জন্যও বিচারিক কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। অবহেলা আর অকার্যকর অবস্থায় ফেলে রাখায় শত কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হতে বসেছে। দীর্ঘদিন বন্ধ পড়ে থাকা এই কোটি কোটি টাকার সরকারি স্থাপনাটি নিয়ে গত কয়েক বছরে একাধিক আলোচনা হলেও সমাধানে আসা যায়নি।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপুও এ ভবনটি নিয়ে কথা বললে সেটি আবারো আলোচনায় আসে।
সংসদ সদস্য এ ভবনটি কোনো কাজে আসছে না উল্লেখ করে এটিকে ব্যবহারের জন্য দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণেরও দাবি জানান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আইনজীবীদের আপত্তির কারণেই মূলত এ ভবনটিতে নিম্ন আদালতের বিচারিক কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। ফলে, নতুন ভবন থাকতেও জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কার্যক্রম চলছে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও জেলা ও দায়রা জজ আদালতের ভবনের একটি অংশে। তবে, আইনজীবীদের আপত্তি জানানোর পেছনে যৌক্তিকতার কথা জানিয়েছেন তারা।

নথিপত্র বলছে, এক সময় শায়েস্তা খাঁ সড়কে একই ভবনে জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের বিচারিক কার্যক্রম চলতো। পরে চাঁদমারী এলাকায় তা স্থানান্তর করা হয়। সেখানে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের ভবন থাকলেও চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য আলাদা ভবন নির্মাণ করা হয়নি। সেখানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভবন ও জেলা আদালত ভবনের একটি অংশে এখনো বিচারিক কার্যক্রম চলছে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের।

তবে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার সারাদেশে নিম্ন আদালতের কার্যক্রম বেগবান করার উদ্দেশ্যে ৬৪ জেলায় পৃথক ও নতুন চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবন নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়। ওই সময় জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাশে জমি না পাওয়ায় শায়েস্তা খাঁ সড়কেই নির্মাণ করা হয় চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবন। ‘৬৪ জেলায় চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন’ প্রকল্পের আওতায় আটতলার এ ভবনটি নির্মাণের দায়িত্ব পায় গণপূর্ত অধিদপ্তর।

৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালে ভবনটি নির্মাণকাজ শেষ করার পর সেটি আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তরও করে বাস্তবায়নকারী এ সংস্থাটি। কিন্তু আইনজীবীরা আপত্তি জানালে এ ভবনে বিচার কার্যক্রম স্থানান্তর করা যায়নি।

আইনজীবীরা ওই সময় শায়েস্তা খাঁ সড়কে নতুন ভবনে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কার্যক্রম শুরু করা নিয়ে ঘোর বিরোধীতা করেন। তাদের ভাষ্যমতে, নতুন বহুতল ভবনটি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত (ফতুল্লার চাঁদমারী) এলাকা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। দেশের প্রায় সব জেলাতেই জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত একই কম্পাউন্ডে বা কাছাকাছি থাকলেও নারায়ণগঞ্জে দুই ভবনের দূরত্ব বিচারিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাবে।

আইনজীবীরা বলেন, আসামিদের ভোগান্তি ও ঝুঁকি অনেক সময় একই দিনে একজন আসামির জেলা জজ আদালত ও ম্যাজিস্ট্রেট আদালত উভয় স্থানেই হাজিরা থাকে। দুই কিলোমিটার দূরত্ব যাতায়াত করতে গিয়ে আসামিদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ে। প্রতিদিন কয়েকশ’ বিচারক, আইনজীবী, পুলিশ সদস্য ও হাজারও বিচারপ্রার্থীকে দুই আদালতের মধ্যে বারবার যাতায়াত করতে হবে, যা অতিরিক্ত ভোগান্তি ও সময় অপচয়ের কারণ হবে।

ফলে, নতুন ভবনে কার্যক্রম শুরু না করার দাবিতে ওই সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক মতাদর্শের আইনজীবীরাও ছিলেন ঐকমত্যে। তাদের দাবির কারণেই ওই ভবনে আর কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। সরকার কিংবা প্রশাসনিকভাবে পরে আর এ বিষয়নি নিয়ে এগোয়নি।

এদিকে, কোটি কোটি টাকার এ ভবনটি অব্যহৃত হিসেবে পড়ে থাকায় ভেতরের লাইট, ফ্যান ও অন্যান্য জিনিসপত্র অযত্নে অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। এ কারণে আদালতের কার্যক্রম শুরু না করা গেলে অন্য কোনো সরকারি সংস্থার কাজে ব্যবহারেরও দাবি জানান অনেকে। ভবনটিকে স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে হাসপাতাল কিংবা মেডিকেল কলেজে রূপান্তরের দাবিও উঠেছিল নাগরিক ও রাজনৈতিক মহল থেকে। করোনা অতিমারীর সময় নমুনা পরীক্ষার কাজে এ ভবনের একটি অংশ ব্যবহার করা হলেও পরে সেটি আবারও ফাঁকাই পড়ে থাকে।

দীর্ঘ ৮ বছর ধরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত একটি ভবন ব্যবহার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সুশীল সমাজ ও স্থানীয় জনগণ। সরকারের কোটি কোটি টাকার সম্পদ এভাবে পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ায় বিভিন্ন মহল থেকে ভবনটি বিকল্প কোনো রাষ্ট্রীয় কাজে লাগানোর দাবি উঠেছে।

নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বার সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপুও বলেছেন, অব্যবহৃত এই ভবনটিকে জনকল্যাণমূলক কাজ- বিশেষ করে একটি আধুনিক হাসপাতাল বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার জোর দাবি জানিয়েছেন।

কিন্তু এর আগেও ভবনটিকে সরকারি মেডিকেল কলেজ কিংবা হাসপাতাল, কলেজের অবকাঠামো বা বিভিন্ন সরকারি অফিসের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের বেশ কয়েকটি প্রস্তাব উঠলেও কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায়নি।

নতুন সরকার প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের দাবির পর এ নিয়ে নতুন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় কিনা তা এখন অপেক্ষা।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়