মদনপুরে একতা সুপার মার্কেট দখলের অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মদনপুরে সমবায়ভিত্তিক একতা সুপার মার্কেট দখলের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাজহারুল ইসলাম হিরনের বিরুদ্ধে। মার্কেটের পরিচালনা কমিটির অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালামের ছেলে ও তাঁর রাজনৈতিক সচিব আবুল কাউসার আশার প্রভাবে গত ২৩ সেপ্টেম্বর বহিরাগত লোকজন নিয়ে মার্কেটটি দখল করা হয়। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এক ব্যবসায়ী।
এদিকে মার্কেটের বর্তমান পরিচালনা কমিটিকে অবৈধ দাবি করে নতুন নির্বাচনের আবেদন জানিয়ে করা রিভিশন আবেদন খারিজ করেছেন আদালত। এতে ২০২৪ সালের ১৯ জানুয়ারি নির্বাচিত এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মেয়াদ থাকা ১২ সদস্যের পরিচালনা কমিটি বহাল রয়েছে।
আদালত সূত্র জানায়, একতা সুপার মার্কেটের বর্তমান পরিচালনা কমিটিকে অবৈধ দাবি করে আমিনুল গংয়ের পক্ষ থেকে নতুন নির্বাচনের আবেদন জানিয়ে রিভিশন আপিল করা হয়। গত ১৯ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত-৪-এর বিচারক নিভানা খায়ের জেসী আবেদনটি নামঞ্জুর করেন। এতে বন্দর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের আগের রায় বহাল থাকে।
আদালতের আদেশের পর বৈধ পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, অবৈধ দখলদারদের দোকান ভাড়া বা অগ্রিম অর্থ দিলে এর দায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বহন করতে হবে।
পরিচালনা কমিটির অভিযোগ, গত ২৩ সেপ্টেম্বর হিরনের নেতৃত্বে ২০০ জনের বেশি বহিরাগত লোকজন মার্কেটটি দখলে নেন। এ সময় আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত খলিল মেম্বার বাহিনীর সদস্যরাও তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। অভিযোগে বলা হয়, সংসদ সদস্যের ছেলে আবুল কাউসার আশাকেও সেদিন হিরনের সঙ্গে দেখা যায়। মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মারধর করে বের করে দিয়ে কার্যালয় দখল করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দখলের পর থেকে রাতে মার্কেটের ছাদে মহড়া ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে জোর করে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
মার্কেটের নিচতলার মেসার্স ময়মুনা আক্তার ড্রাগ হাউজের মালিক ও মদনপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি কাবিল হোসেন বলেন, “দখলের পর থেকে চাঁদার দাবিতে আমার প্রায় ৮০ লাখ টাকার মালামাল থাকা ওষুধের দোকানটি জোরপূর্বক তালা মেরে বন্ধ করে রাখা হয়েছে।”
মার্কেটের সুপারভাইজার ও মদনপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাবুল মিয়া অভিযোগ করেন, “আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে গিয়ে ১১টি মামলার শিকার হয়েছি। আর আজ নিজ দলের নেতারাই আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নিয়ে এসে আমাদের রুটি-রুজির জায়গা দখল করছে। রাতে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দেওয়া হচ্ছে।”
মার্কেট দখলমুক্ত করা ও বন্ধ দোকান খুলে দেওয়ার দাবিতে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন কাবিল হোসেন। অভিযোগে আবুল কাউসার আশা, মাজহারুল ইসলাম হিরন ও খলিল মেম্বারসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। এর আগে জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারের কাছেও একই ধরনের অভিযোগ দেওয়া হয়।
একতা সুপার মার্কেট মালিক বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন বলেন, ১৯৯৭ সালে ১০১ জন সদস্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে জমি কিনে নেন। পরে ২০০০ সালে মার্কেট পরিচালনার জন্য ৩৩৬ নম্বর নিবন্ধনে সমবায় সমিতি গঠন করা হয়। সমবায় আইন মেনে প্রতি তিন বছর পরপর নির্বাচন ও সরকারি অডিট হয়ে আসছে। বর্তমান কমিটির মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত থাকলেও হিরন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মার্কেট দখল করেছেন বলে অভিযোগ তাঁর। তিনি আরও বলেন, হিরন বা তাঁর সহযোগীরা সমিতির সাধারণ সদস্যও নন।
গত ৮ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে হিরন মার্কেটে আবুল কাউসার আশাকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তার দাবি, মার্কেটে ‘স্বৈরাচারের দোসরদের’ ঠেকাতে তারা সেখানে গিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, সমিতির বৈধ নথি, সদস্য তালিকা ও আদালতের আদেশের কথা তুলে ধরে পরিচালনা কমিটির সদস্যরা তার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তাদের লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, হিরনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এর আগে পুলিশ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে অর্থ দাবির একটি অডিও ফাঁসের পর তাকে দল থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সখ্য, অবৈধ গরুর হাটের অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাকে বহিষ্কারের দাবিও জানিয়েছিলেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের একাংশের নেতাকর্মীরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দলের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের নাম ব্যবহার করে এবং আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে হিরন ও তার সহযোগীরা মদনপুরে আতঙ্ক তৈরি করেছেন। তারা মার্কেটটি দখলমুক্ত করতে প্রশাসন ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।





































