শ্রমিকদের অবরোধে লিংক রোডে জনদুর্ভোগ, হেঁটেই গন্তব্যে যাত্রীরা
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের অবরোধে প্রায় চার ঘণ্টা পুরোপুরি বন্ধ ছিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে যান চলাচল। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রী ও পথচারীরা। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের ব্যাগ-বোঝা নিয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়। পণ্যবাহী বিভিন্ন পরিবহনকেও ঘন্টার পর ঘন্টা যানজটে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফতুল্লার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। আধা ঘণ্টা পর তারা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ করেন। এতে সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
জরুরি কাজে ঢাকার উদ্দেশে বের হয়ে শিবু মার্কেটে আটকে পড়েন সোহেল নামে এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, “ঢাকা যাওয়ার জন্য বের হয়েছিলাম, কিন্তু রাস্তার এই অবস্থার জন্য যাওয়ার কোনো উপায় নেই। অনেক যানজট আর অবরোধে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই।”
হাতে ও কাঁধে ভারী ব্যাগ নিয়ে জেলা পরিষদ এলাকা থেকে পায়ে হেঁটে রওনা হওয়া হারুন বলেন, “শ্বশুরবাড়ি পাগলা যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম। কিন্তু রাস্তায় এসে দেখি বাস-অটোরিকশা সব বন্ধ।
অর্ধেক পথ চলে আসায় এখন না পারছি বাসায় ফিরতে, না পারছি গন্তব্যে পৌঁছাতে। ফতুল্লা স্টেডিয়ামের সামনে এসে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, একটু পরপর বিশ্রাম নিচ্ছি আর হাঁটছি।”
ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ভাইপোর জন্য খাবার নিয়ে যাওয়ার পথে ফতুল্লা স্টেডিয়ামের সামনে আটকে পড়েন মীর ওয়াশেক আলী। তিনি বলেন, “শিবু মার্কেট থেকে সাইনবোর্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম হাসপাতালে ভাইপোর জন্যে খাবার দিতে। কিন্তু দীর্ঘ পথ হাঁটার পর এখানে এসে দেখি যান চলাচল পুরো বন্ধ। বাধ্য হয়ে খাবার নিয়ে আবার বাসায় ফিরে যেতে হচ্ছে।”
ভোগান্তিতে পড়া এক নারী পথচারী বলেন, “আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কী অপরাধ? সঙ্গে বাচ্চা ও ভারী ব্যাগ নিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হচ্ছে। কোনো গাড়ি নেই, একটা রিকশাও পাওয়া যাচ্ছে না। শ্রমিকদের দাবি থাকতে পারে, কিন্তু এভাবে পথ আটকে হাজার হাজার মানুষকে কষ্ট দেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না।”
সিলেট থেকে আসা হাজেরা বেগম সাইনবোর্ড এলাকায় বাস থেকে নামেন। পরে আধা কিলোমিটার ব্যাটারিচালিত রিকশায় যাওয়ার পর তাঁকে নেমে হাঁটতে হয়। তাঁর গন্তব্য চাষাঢ়া, যা সেখান থেকে অন্তত ছয় কিলোমিটার দূরে।
হাজেরা বলেন, “একা একজন মহিলা মানুষ আমি দুইটা ব্যাগ নিয়ে এত পথ কেমনে হাঁইটা যামু তাই ভাবতেছি।”
অন্যদিকে, ফতুল্লা স্টেডিয়াম এলাকায় গরুবোঝাই পিকআপ ভ্যান নিয়ে যানজটে আটকে পড়েন চালক আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, “কাঞ্চন ব্রিজ থেকে রওয়ানা হইছিলাম, গরু নিয়ে যাবো গোগনগর। কিন্তু এক জায়গায়ই গত দুই ঘণ্টা ধরে বসে আছি। সামনে কতটুকু যানজট তাও বুঝতেছি না।”
বেলা আড়াইটার দিকে সড়কের ভূঁইগড় এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। তবে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে শ্রমিকেরা কিছুটা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। পরে শিবু মার্কেট এলাকায় তাঁরা আবার জড়ো হলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
আন্দোলনরত শ্রমিকেরা বলেন, তাঁদের বাঁচার মতো মজুরি দিতে হবে। বেতন না বাড়ালে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নিত্যপণ্যের দাম কমানোর দাবি জানান তাঁরা। তাঁদের দাবি, মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। এ সময় ঢাকা ও গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনে হতাহতের ঘটনার প্রতিবাদ জানান তাঁরা। পাশাপাশি বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের পদত্যাগ দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
ঘটনাস্থল থেকে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) বলেন, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে কয়েকটি কারখানার কয়েকশ শ্রমিক সড়কে নেমে অবরোধ করেন। এতে যান চলাচল বিঘ্নিত হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। সড়কে পুলিশের সাঁজোয়া যান ও জলকামানের গাড়িও প্রস্তুত রাখা হয়।
বিক্ষোভের মধ্যে জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান শ্রমিকদের উদ্দেশে বলেন, “কেউ উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করবেন না। সরকার আপনাদের নিয়ে কাজ করছে। আপনাদের বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত আসবে।”
বিক্ষোভের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদ, জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান, মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম সজল এবং জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি। তাঁরা শ্রমিকদের শান্ত থাকা ও স্বাভাবিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
বিকেল সাড়ে চারটার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদের সড়কের এক পাশে সরিয়ে নিলে যান চলাচল শুরু হয়। তবে শ্রমিকেরা তখনো বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বিকেল পাঁচটার পর তাঁরা সড়ক থেকে সরে যেতে শুরু করলে যান চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়।





































