১৪ আগস্ট ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২০:৪৫, ১৪ আগস্ট ২০২৬

খাল দখল-দূষণে পানিবন্দী শতাধিক পরিবার, বাড়ছে দুর্ভোগ

খাল দখল-দূষণে পানিবন্দী শতাধিক পরিবার, বাড়ছে দুর্ভোগ

খাল দখল ও শিল্পকারখানার বর্জ্যে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে নারায়ণগঞ্জের বন্দরের লাউসার এলাকায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। স্থানীয়ভাবে কালাখাল নামে পরিচিত আতুরাখাল দখল ও দূষণের কারণে পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের সক্ষমতা হারাচ্ছে। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের বিভিন্ন অংশে মাটি, বালু ও বর্জ্য ফেলে ভরাট করা হয়েছে। কোথাও খালের পাড় দখল করে দোকান ও স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এর সঙ্গে আশপাশের টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানার বর্জ্য মিশে খালের পানি কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, লাউসার থেকে মদনপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত খালের বিভিন্ন অংশে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত। কোথাও বাঁশ দিয়ে খালের ওপর দোকান বসানো হয়েছে, কোথাও পাড় ভরাট করে জায়গা দখল করা হয়েছে। খালের পানিতে পলিথিন, প্লাস্টিক, কাপড়ের বর্জ্য ও গৃহস্থালির আবর্জনা জমে আছে।

কোথাও কোথাও পানির ওপর রঙিন ফেনা ভাসতে দেখা যায়। খালের আশপাশে ছড়িয়ে পড়েছে দুর্গন্ধ। স্থানীয়দের অভিযোগ, শিল্পকারখানার বর্জ্য খালে পড়ার কারণেই পানির এমন অবস্থা হয়েছে।

লাউসারের বাসিন্দা হোসনে আরা বেগম বলেন, “আগে বৃষ্টি হলে পানি খাল দিয়ে নেমে যেত। এখন খাল ভরাট হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তা ও বাড়িতে পানি ঢুকে যায়। টেক্সটাইল মিলের ময়লা পড়ে পানি কালো হয়ে গেছে। আমাদের খাবার ও ব্যবহার করার মতো পানিও নেই।”

আরেক বাসিন্দা রিপা আক্তার বলেন, “ঘরের ভেতরে যে পানি ঢুকেছে, সেটি পরিষ্কার পানি নয়। দুর্গন্ধ করে। বাচ্চারা পানির মধ্য দিয়ে স্কুলে যায়। তাদের পায়ে ও শরীরে চর্মরোগ দেখা দিয়েছে।”

ইমান আল নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। তাই এই পানির মধ্যেই থাকতে হচ্ছে। ঘরে হাঁটুসমান পানি। পায়ে চুলকানিসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দিয়েছে। এই পানির কারণে আমার কয়েকটি হাঁসও মারা গেছে।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, আতুরাখাল একসময় এলাকার পানি নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান পথ ছিল। বর্ষার পানি ও বসতবাড়ির অতিরিক্ত পানি এই খাল দিয়ে নেমে যেত। কিন্তু বছরের পর বছর দখল, ভরাট ও বর্জ্য ফেলার কারণে খালটি এখন পানি নিষ্কাশনের বদলে জলাবদ্ধতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মদনপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন বলেন, “কিছুদিন আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরেজমিনে এসে খালটি পরিদর্শন করেছিলেন। পরে সাময়িকভাবে খাল পরিষ্কার করে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। এতে কিছুটা স্বস্তি মিললেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়।”

তিনি বলেন, “খালের বিভিন্ন জায়গায় দখল ও ময়লা-আবর্জনা জমে থাকায় আবার পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। লাউসারের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পানিবন্দী অবস্থায় কষ্ট করছেন। বিশেষ করে শিশুদের স্কুলে যাতায়াতে দুর্ভোগ হচ্ছে। খালটি দখলমুক্ত করে স্থায়ীভাবে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করা জরুরি।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের পাশের জামাল টেক্সটাইল প্রাইভেট লিমিটেড কারখানার অপরিশোধিত তরল বর্জ্য সরাসরি খালের পানিতে ফেলা হয়। যা এ খালের পানি দূষণের অন্যতম কারণ। তবে, এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে কারখানা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মদনপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিবানী সরকার বলেন, “প্রথমবার যখন এলাকাটি পানিবন্দী হওয়ার খবর পাই, তখন মদনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে আমি নিজেই সরেজমিনে পরিস্থিতি পরিদর্শন করি। পরে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে সাময়িকভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।”

তিনি বলেন, “আবার বৃষ্টির পর ওই এলাকায় পানি জমেছে এ বিষয়টি আমাকে আগে জানানো হয়নি। বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছি এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।”

তবে ইউএনও বলেন, “মূল সমস্যা শুধু পানি জমে থাকা নয়, পানি নিষ্কাশনের পথেই বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। খালের যে অংশ দিয়ে পানি বের হওয়ার কথা, সেখানে অবৈধ স্থাপনা, দোকানপাট ও দখল রয়েছে। এসব কারণে পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারছে না।”

তিনি জানান, বিষয়টি চিহ্নিত করে ইতোমধ্যে সড়ক ও জনপথ বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। খালের পানি প্রবাহের পথে থাকা অবৈধ স্থাপনা ও দোকানপাট উচ্ছেদে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে।

“শুধু একবার খাল পরিষ্কার করে বা সাময়িকভাবে পানি সরিয়ে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। খাল দখলমুক্ত করার পাশাপাশি পানি প্রবাহের পথ নিশ্চিত করতে হবে,” বলেন শিবানী সরকার।

তিনি আরও বলেন, স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে খালের যেসব জায়গায় পানি আটকে যাচ্ছে, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রতিবন্ধকতা দূর করা হবে। ভবিষ্যতে যাতে খাল দখল করে স্থাপনা নির্মাণ বা পানি চলাচলের পথ বন্ধ করা না হয়, সে বিষয়েও নজরদারি প্রয়োজন।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়