১৮ আগস্ট ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২১:৫০, ১৭ আগস্ট ২০২৬

রাজনীতিতে ‘হোন্ডা মহড়া’র একাল-সেকাল

রাজনীতিতে ‘হোন্ডা মহড়া’র একাল-সেকাল

নারায়ণগঞ্জ শহরে এক সময় ‘হোন্ডা বাহিনী’র আতঙ্কে দিন পার করেছে নগরবাসী। বিরোধী মতের দমন কিংবা সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা, উভয় ক্ষেত্রেই মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া ছিল প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। মোটরসাইকেলের এসব মহড়া দেওয়া সন্ত্রাসীরা শহরে ‘হোন্ডা বাহিনী’ হিসেবে পরিচিতি পায়। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পালাবদল হলেও নারায়ণগঞ্জে মোটরসাইকেলের মহড়া দেওয়ার চর্চা এখনো যায়নি। রাজনৈতিক নেতাদের নেতৃত্বে এখনো মোটরসাইকেল মহড়া অব্যাহত রয়েছে। এতে নতুন করে ‘হোন্ডা বাহিনী’ গড়ে ওঠার শঙ্কা করছেন অনেকে।

নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, হোন্ডা বাহিনীর এসব কার্যক্রমে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিলেন প্রয়াত সংসদ সদস্যের ছেলে আজমেরী ওসমান। অসংখ্য খুন, গুম, নির্যাতন, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্য অভিযুক্ত ওসমান পরিবারের এ সদস্যের ছিল নিজস্ব ‘হোন্ডা বাহিনী’।

স্থানীয়রা বলছেন, চাঁদাবাজি, দখল ও আধিপত্য বিস্তারের জন্য এ বাহিনীকে ব্যবহার করতেন আজমেরী ওসমান। আওয়ামী লীগের দেড় দশকের ক্ষমতায় থাকাকালীন আজমেরী ওসমানের এ বাহিনী ছিল সবচেয়ে আলোচিত।

প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলেও চর্চিত ছিল ‘হোন্ডা বাহিনী’। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময়ই এ ‘হোন্ডা বাহিনী’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার দাবি একাধিকবার তুলেছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নিজেও। নাগরিক মহল থেকেও বিভিন্ন সময় এ বাহিনীর কথা উঠে আসে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জের বহুল প্রচারিত দৈনিক পত্রিকা ‘সময়ের নারায়ণগঞ্জ’র কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে।

হামলার ঘটনার দিন সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শহরের চাষাঢ়ায় অবস্থিত পত্রিকাটির কার্যালয়ে হামলার আগে মোটরসাইকেলের মহড়া দেন আজমেরী ওসমানের সন্ত্রাসী বাহিনী। হামলার পরও তারা কয়েকশʼ মোটরসাইকেল নিয়ে প্রধান সড়ক বঙ্গবন্ধু সড়কে মহড়া দেয়। ওই সময় এ হোন্ডা বাহিনী বেশি আলোচনায় আসে।

যদিও পরে এ হামলার ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততা না থাকার দাবি করেছিলেন আজমেরী ওসমান। কিন্তু হামলার ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে যাদের দেখা যায় এবং মামলায় অভিযুক্ত ও গ্রেপ্তার আসামির তালিকায় যাদের নাম ছিল তারা ছিলেন আজমেরী ওসমানেরই অনুসারী। এমনকি,  ত্বকী হত্যা মামলায় র‌্যাবের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে আজমেরী ওসমান ও তার সহযোগীদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে নাম আসা নিয়ে পত্রিকাটি সংবাদ প্রকাশের পরই এ হামলার ঘটনা ঘটে।

এরপর, ২০২৩ সালের মার্চে বন্দরে জমি দখল করতে গিয়ে সশস্ত্র হামলা চালায় আজমেরী ওসমানের এ ‘হোন্ডা বাহিনী’। হামলার দিন আজমেরী আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী আলী হায়দার শামীম ওরফে পিজা শামীম এর নেতৃত্বে মোটরসাইকেলের মহড়া দিয়ে গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে জমির মালিক মঈনুল হক পারভেজ পরে মারা যান।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, আওয়ামী লীগের আমলে নগরীর বাইরে উপজেলা এলাকাতেও মোটরসাইকেল মহড়া ছিল ওই সময় বিরোধী মত দমনের অন্যতম চর্চা। ওই সময় বিএনপি কিংবা বিরোধী দলীয় সংগঠনের যেকোনো কর্মসূচির বিপরীতে মোটরসাইকেল মহড়া দিতেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। ‘শান্তি মিছিলের’ নামেও কয়েকশ’ মোটরসাইকেল নিয়ে আতঙ্ক তৈরি করতেন এলাকাজুড়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও এই মোটরসাইকেলের মহড়ার চর্চা বদলায়নি। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতারাও অনুসারীদের নিয়ে মোটরসাইকেল মহড়া অব্যাহত রেখেছেন।

সম্প্রতি ১৫ আগস্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের আদর্শিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীকে ঘিরে দলটির নেতা-কর্মীদের ‘অপতৎপরতা’ ঠেকাতে বিএনপির কয়েকজন নেতাকে মোটরসাইকেলে মহড়া দিতে দেখা গেছে।

নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক সচিব ও মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাউসার আশার নেতৃত্বে মোটরসাইকেল মহড়া দেওয়া হয় বন্দরে। অন্যদিকে, আলোচিত সাবেক ছাত্রদল নেতা জাকির খানও মোটরসাইকেলের মহড়া দিয়েছেন। জাকির খান বেশ কয়েকটি হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির মামলায় অভিযুক্ত থাকলেও গণঅভ্যুত্থানের পর এসব মামলায় খালাস ও জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বের হন।

মোটরসাইকেলের মহড়া দিতে দেখা গেছে মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব শাহেদ আহমেদকেও। জোড়া খুন মামলায় অভিযুক্ত শ্রমিক নেতা বাবুরাইলের শহীদ আহমেদের অনুসারীদেরও প্রায় সময় মোটরসাইকেলের মহড়া দিতে দেখা গেছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিনের বিরুদ্ধেও তারা মোটরসাইকেল মহড়া দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকশ’ মোটরসাইকেলের এসব প্রদর্শনী ও মহড়া মানুষকে আতঙ্কিত করে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও একই চর্চা পুনরায় এ শহরে ‘হোন্ডা বাহিনী’ গড়ে ওঠার শঙ্কা নারায়ণগঞ্জবাসীর।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়