গ্যাস সংকটে কাজ নেই, ধারদেনায় দিন কাটছে শ্রমিকদের
গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিদেশি ক্রয়াদেশ নিতে পারছে না নারায়ণগঞ্জের অনেক ছোট ও মাঝারি পোশাক কারখানা। এতে কমে গেছে শ্রমিকদের কাজ ও আয়। নিয়মিত কাজ না থাকায় সংসার চালাতে ধারদেনা করতে হচ্ছে অনেক শ্রমিককে। একই সঙ্গে কারখানা থেকে ছাঁটাই হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে তাদের মধ্যে।
নারায়ণগঞ্জ শহরের কালীরবাজার এলাকার সিএফএইচ ফ্যাশনের শ্রমিক আমেনা বেগম এমনই একজন। গত পাঁচ বছর ধরে কারখানাটিতে মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন ৩৫ বছর বয়সী এই নারী। তবে তিনি মাসিক বেতনভুক্ত নন; কাজের পরিমাণ অনুযায়ী মজুরি পান। ফলে কাজ কমে যাওয়ায় সরাসরি কমে গেছে তার আয়ও।
সোমবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে কালীরবাজারে কারখানাটিতে কথা হয় আমেনার সঙ্গে। তিনি বলেন, গত দুই মাস ধরে গ্যাস সংকটের কারণে কারখানায় কাজ কমে গেছে। বিদেশি ক্রয়াদেশও ঠিকমতো নিতে পারছেন না মালিকপক্ষ। ফলে তার মতো চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকদের নিয়মিত কাজ মিলছে না।
“কাজ তো খুবই কম। খাইয়া না খাইয়া কোনো রকম চলতে হচ্ছে। আমার স্বামীও পোশাক শ্রমিক, তারও কাজ নাই। ভাড়া বাসায় থাকি, সংসারেও অনেক খরচ। বাচ্চাদের নিয়ে খুবই সমস্যার মধ্যে আছি আমরা,” বলেন আমেনা।
তিনি জানান, কাজ কমে যাওয়ায় গত দুই মাস ধরে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে সংসারের খরচ চালাতে হচ্ছে। পাশাপাশি কাজ হারানোর আশঙ্কাও করছেন তিনি।
একই কারখানার শ্রমিক সারোয়ার হোসেনও পড়েছেন একই সংকটে। তিনি বলেন, “গত মাসে গ্রামে ফোন কইরা মার কাছ থেকে টাকা ধার নিসি। মালিকের অর্ডার কম, আমাদের কাজ দিবে কেমনে? মালিক তো বলতাসে, এমন চলতে থাকলে আমাগো ছাঁটাই করতে হবে।”
সারোয়ার বলেন, কারখানায় পর্যাপ্ত কাজ থাকলে মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব হয়। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে চলতি মাসে ১০ হাজার টাকার কাজও করতে পারেননি।
“আমরা সাধারণত মাসে পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা কাজ করতে পারি, যদি কারখানায় কাজ থাকে। কিন্তু এখন গ্যাস সংকটের কারণে এমন অবস্থা হইসে যে এই মাসে দশ হাজার টাকারও কাজ হয় নাই,” বলেন তিনি।
অর্ডার নিয়েও বিপাকে কারখানা মালিক
সিএফএইচ ফ্যাশনের পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, গ্যাস সংকটের আগে তার কারখানায় প্রায় ৪০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। এখন সেই সংখ্যা কমে ২০ জনে নেমেছে। কিন্তু তাদেরও নিয়মিত কাজ দিতে পারছেন না তিনি।
“আমরা বিদেশি অর্ডার পেলেও নিতে পারছি না। নিলে তো সেটা সময়মতো পাঠাতে পারব না। গ্যাস সংকটে ডাইং বন্ধ। কারখানায় বিদ্যুৎও ঠিকমতো পাওয়া যায় না,” বলেন আমিনুল।
তার ভাষ্য, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন ক্রয়াদেশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, “খবরে দেখলাম অর্থমন্ত্রী বললেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে। এটা আমাদের জন্য কঠিন বার্তা। এভাবে চলতে থাকলে অনেক শ্রমিক ছাঁটাই করতে হবে। বকেয়া বেতন নিয়েও সংকট তৈরি হবে।”
ৎসিএফএইচ ফ্যাশনের মতো নারায়ণগঞ্জের আরও অনেক ছোট ও মাঝারি পোশাক কারখানায় গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। উৎপাদন কমে যাওয়ায় একদিকে যেমন নতুন অর্ডার নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে কাজ কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের আয়ও কমছে।
বিশেষ করে চুক্তিভিত্তিক ও কাজের পরিমাণ অনুযায়ী মজুরি পাওয়া শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। নিয়মিত কাজ না থাকায় তাদের মাসিক আয় অনেক কমে গেছে। ফলে সংসারের খরচ মেটাতে ধারদেনা করতে হচ্ছে অনেককে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে উৎপাদন আরও কমে যেতে পারে। এতে নতুন ক্রয়াদেশ হারানোর পাশাপাশি শ্রমিক ছাঁটাই এবং বেতন-বকেয়া নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শ্রমিকদের ভাষায়, গ্যাসের সংকট এখন শুধু কারখানার উৎপাদন কমাচ্ছে না, সরাসরি তাদের জীবিকার উপর আঘাত আসছে। এই সমস্যার দ্রুত সমাধান কামনা করেন তারা।





































