০৬ আগস্ট ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২০:৩৭, ৫ আগস্ট ২০২৬

বহুদিন পর রক্ত ঝরলো তোলারাম কলেজে

বহুদিন পর রক্ত ঝরলো তোলারাম কলেজে

আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার দেড় দশকে নারায়ণগঞ্জ শহরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি তোলারাম কলেজে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীর পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের মারধরের শিকার হয়েছেন। তোলারাম কলেজের ছাত্র-ছাত্রী সংসদের কক্ষকে রীতিমতো ‘টর্চার সেলে’ রূপান্তর করেছিল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের নেতারা।

কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে গত দুই বছর এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংঘাতের আর কোনো ঘটনা ঘটেনি। দীর্ঘ সময় পর জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে কলেজে আয়োজিত এক সভায় পাল্টাপাল্টি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

বুধবার (৫ আগস্ট) দুপুরে কলেজের পাশের সড়ক আল্লামা ইকবাল রোড (কলেজ রোড) ও চাষাঢ়ায় দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় উভয় ছাত্র সংগঠনের অন্তত ১৫ জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে তোলারাম কলেজের অডিটোরিয়ামে সভা চলছিল। সেখানে ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতারাও বক্তব্য রাখেন। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির একে অপরকে উদ্দেশ্য করে উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখেন।

এ পাল্টাপাল্টি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে পরে আল্লামা ইকবাল রোড (কলেজ রোড) ও চাষাঢ়ায় সংঘর্ষে জড়ান। উভয়পক্ষের লোকজনের হাতে লাঠিসোঁটা, লোহার পাইপ ও বাঁশ দেখা যায়।

তোলারাম কলেজে ছাত্রলীগের ‘টর্চার সেল’

সরকারি তোলারাম কলেজ রাজধানীর পাশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে স্থানীয় রাজনীতির ‘আতুড়ঘর’ বলে অভিহিত করা হয়। এ প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করা অনেকেই স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রেখেছেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ছাড়াও বিগত সময়ের বিভিন্ন গণআন্দোলনে এ কলেজের শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে যখন যে সরকার ক্ষমতায় ছিল তাদের ছাত্র সংগঠনের নেতারা এ কলেজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে সরকারি তোলারাম কলেজে একক নিয়ন্ত্রণ ছিল ছাত্রলীগের। আওয়ামী লীগের পতনের আগ পর্যন্ত এখানে ছাত্র-ছাত্রী সংসদের কোনো নির্বাচন না হলেও স্বঘোষিত সহসভাপতি (ভিপি) পদে ছিলেন ছাত্রলীগের নেতারা। শুরুর দিকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ ছাত্রলীগ নেতা মোস্তাফিজুর রহমান টিটু ভিপি হিসেবে পরিচয় দিয়ে কলেজে আধিপত্য বিস্তার করতেন। এ সময় একাধিক ছাত্র সংগঠনের নেতাদের তোলারাম কলেজের ছাত্র-ছাত্রী সংসদের কক্ষে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।

এরপর ওসমান পরিবারের আরেক ঘনিষ্ঠ ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান রিয়াদ দীর্ঘদিন এ কলেজের ভিপি হিসেবে পরিচয় দিয়ে বেড়ান। তার সময়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী, ছাত্রনেতা ও সাংবাদিক হেনস্থা ও মারধরের শিকার হয়েছেন। রিয়াদ ও তার অনুসারীরা তোলারাম কলেজকে রীতিমতো ‘টর্চার সেলে’ পরিণত করেন।

বিগত সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৫ জুলাই রাতে সরকারি তোলারাম কলেজের সামনের সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মহানগর ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আজীজুল ইসলাম রাজীবসহ ৪ জনকে পেটায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনার নেতৃত্ব দেন হাবিবুর রহমান রিয়াদ। ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে গেলে ছবি ও ভিডিও ধারণে বাধা দিয়ে দুই সাংবাদিককে মারধর করেন তারা। তাদের মোবাইলফোনও ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে সরকারি তোলারাম কলেজে ফরম পূরণ করতে গিয়ে রিয়াদ ও তার লোকজনের মারধরের শিকার হন ওই কলেজের দুই শিক্ষার্থী আতা-ই-রাব্বি ও আব্দুল্লাহ আল মামুন। তারা দুজন ওই কলেজ শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও যুগ্ম-আহ্বায়ক ছিলেন।

২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে কলেজের সামনের সড়কে আরেক শিক্ষার্থী শাহজাহান আলীকে পেটায় রিয়াদের নেতৃত্বে তোলারাম কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। শাহজাহান আলীও ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ায় ছাত্র-ছাত্রী সংসদের কক্ষে মারধরের শিকার হন বর্তমানে মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি অমিত হাসানও। তাকে রিয়াদের নেতৃত্বে বেধরক পেটানো হয়।

তোলারাম কলেজে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ করার জেরে সাংবাদিকের ওপর দুই বার হামলার অভিযোগও আছে। এ ঘটনায় বর্তমানে দ্য ডেইলি স্টারে কর্মরত সাংবাদিক সৌরভ হোসেন সিয়াম ফতুল্লা মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। আরও দুই সাংবাদিককে কলেজে আটকে রেখে হেনস্থা করেছিল ছাত্রলীগের নেতারা।

প্রতিটি ঘটনায় স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে রিয়াদের নাম এলেও, প্রভাবশালীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকার কারণে রিয়াদের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার সাহস কেউ করেনি। ফলে, কলেজের ভেতর ছাত্রলীগ ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে। এমনকি ছাত্রলীগের বাইরে অন্য কোনো সংগঠনের কার্যক্রমও অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ ছিল এখানে। সাধারণ শিক্ষার্থীরাও তটস্থ থাকতো ছাত্রলীগের ভয়ে।

গণঅভ্যুত্থানের পর পাল্টায় পরিবেশ

২০২৪ সালে জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর পাশের নারায়ণগঞ্জ শহর ছিল উত্তাল। এ সময় সরকারি তোলারাম কলেজের শিক্ষার্থীরাও এতে অংশ নেন। এ কলেজের চারজন শিক্ষার্থী আন্দোলনে শহীদও হয়েছেন। গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তোলারাম কলেজের পরিবেশ বদলে যায়।

গত দুই বছর এ কলেজে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা সহাবস্থানে ছিলেন। তারা একে-অপরের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করেছেন। অভ্যুত্থানের পর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্র ফেডারেশন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, নতুন ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তিসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীদের অবাধ বিচরণ ছিল কলেজে।

দীর্ঘদিন পর সংঘাত

কিন্তু ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে এ রাজনৈতিক সহাবস্থান আর নেই। গত মে মাসে কলেজে নবীন বরণ উৎসবকে কেন্দ্র করে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসে। এ নিয়ে টানা কয়েকদিন কলেজ ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করলেও তা সংঘাতে রূপ নেয়নি।

কিন্তু দুই বছর পর জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসেই সংঘাতে জড়িয়েছে এ কলেজের দু’টি ছাত্র সংগঠন- ইসলামী ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। বুধবার দুপুরের ওই সংঘাতে উভয়পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি শান্ত রাখতে ছাত্রাবাস বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কলেজ প্রশাসন।

ঘটনার পর কলেজে গিয়েছিলেন বিএনপির নেতারা। তারা কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। অন্যদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জামায়াতে ইসলামীও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। উভয় দলের নেতারা সহাবস্থান বজায় রাখারও ডাক দিয়েছেন।

এ সংঘর্ষের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন একাধিক ছাত্র সংগঠনের নেতারা।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের নজরদারিও অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) মো. হাসিনুজ্জামান।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়