১৬ জুন ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২২:৪৬, ১৫ জুন ২০২৬

আপডেট: ২৩:০১, ১৫ জুন ২০২৬

চাষাঢ়ায় আ.লীগ অফিসে বোমা হামলার ২৫ বছর: ক্ষমতার পালাবাদলে থমকে বিচার

চাষাঢ়ায় আ.লীগ অফিসে বোমা হামলার ২৫ বছর: ক্ষমতার পালাবাদলে থমকে বিচার

১৬ জুন, ২০০১। শনিবার। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছিল। নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে তখন নেতাকর্মীদের আনাগোনাও ছিল বেশ। এতসব ব্যস্ততা আর রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যেই হঠাৎ নেমে আসে বিভীষিকার অন্ধকার। একের পর এক বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে নারায়ণগঞ্জ শহর। বোমার গর্জনে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ। রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অনেকে।

ভয়াবহ এ বোমা হামলায় প্রাণ হারান দলটির নেতা-কর্মীসহ ২০ জন। আহত হন তৎকালীন সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানসহ অর্ধ শতাধিক।

কিন্তু এই ঘটনার ২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও হয়নি বিচার, দোষীরা পাননি শাস্তি। রাজনৈতিক স্বার্থ ও ক্ষমতার পালাবদলে দীর্ঘসূত্রিতার বেড়াজালে আটকে আছে এ হত্যা মামলাটি।

রাষ্ট্রপক্ষের এক কৌঁসুলি জানালেন, আদালত গত বছরের ১ আগস্ট এই মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণ করলেও সেদিন তা ঘোষণা হয়নি। মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা সম্পূরক অভিযোগপত্রের পূর্ণাঙ্গ মূলকপি আদালতে জমা না দেওয়ায় তাকে তলব করা হয়েছে।

দুই যুগেরও বেশি সময় আগে ঘটে যাওয়া এ বোমা হামলার পর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দু’টি মামলা করেন। মামলায় তৃণমূল বিএনপি’র মহাসচিব অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার, মহানগর বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত হাশেম শকুসহ ২৭ জন বিএনপি নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়। তৈমুর আলম নিজেও ওই সময় জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে দল বদলে নতুন সংগঠনে যোগ দেন তিনি।

দুই বছরের মাথায় ২০০৩ সালে তদন্ত শেষে বলা হয়, এদের কেউই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। মামলা থেকে এজাহারে অভিযুক্তদের অব্যাহতি দিতে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে আবেদন করে পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা।

অভিযুক্ত বিএনপি নেতাদের মামলা থেকে বাদ দিয়ে এ প্রতিবেদন যখন জমা পড়ে তখন সরকারে ছিল বিএনপি।

ওই সময় আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, তার ভাই জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান ও সেলিম ওসমানসহ ৫৮ জনকে আসামি করে আরেকটি পাল্টা মামলা হয়। মামলার বাদী হন বোমা হামলায় নিহত এক চা দোকানি হালিমা বেগমের ছেলে আবুল কালাম। পরে উচ্চ আদালতে এ মামলাটি খারিজ হয়ে যায়।

আওয়ামী লীগ নেতার করা মামলাটি দীর্ঘদিন হিমাগারে থাকার পর আওয়ামী লীগ সরকারে আসলে ২০০৯ সালে আদালতের আদেশে পুনরায় তদন্ত শুরু করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ২০১৩ সালে দু’টি মামলায় মোট ৯৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দেয় তদন্তকারী সংস্থাটি। এতে ছয়জনকে অভিযুক্ত ও ৩১ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

অভিযোগপত্রে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত যুবদলের কর্মী মমিনউল্লাহ ডেভিডের ভাই শাহাদাত উল্লাহ জুয়েল, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান (অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত), জঙ্গি নেতা ওবায়দুল্লাহ রহমান, তার ভাই ভারতের দিল্লি কারাগারে আটক আনিসুল মোরসালিন, মুহিবুল মুত্তাকিন এবং সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা শওকত হাশেম শকুকে অভিযুক্ত করা হয়।

তবে ২০২০ সালে আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে এই মামলার অন্যতম সাক্ষী ও আহতের তালিকায় থাকা আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান অভিযোগপত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। “চার্জশিটে এমন অনেকের নাম আছে, যারা ঘটনার সঙ্গে যুক্ত নয়। আবার প্রকৃত অপরাধীরা বাদ গেছে,” আদালতে এমন সাক্ষ্য দেন তিনি।

একই কথা সাক্ষ্য দিয়ে বেরিয়ে সাংবাদিকদেরও বলেন তিনি। সাংবাদিকদের দেওয়া বক্তব্যে শামীম ওসমান আরও বলেন, এ ঘটনায় তৈমুর আলম খন্দকার ও শওকত হাশেম শকুর সম্পৃক্ত ছিলেন বলে তিনি মনে করেন না।

শওকত হাশেম শকু ওই সময় শামীম ওসমানের মেজোভাই সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিতি পান। অন্যদিকে, দুই বছর পর ২০২২ সালে তৈমুর আলম খন্দকার জেলা বিএনপির আহ্বায়ক পদে থাকা অবস্থায় দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে অংশ নেন। ওই সময় ওসমান পরিবার তাকে নির্বাচনে সহযোগিতা করেছিল বলেও অভিযোগ ওঠে।

হামলায় নিহত ছিলেন যারা

ঘটনার দিন চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে সভা চলছিল। বিকেলে শুরু হওয়া সভাটিতে দলটির বিভিন্ন ইউনিটের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ সময় সভা চলার কারণে কেউ কেউ বাইরে বেরিয়ে উঁকিঝুকিও মারছিলেন। এমন সময় বোমা হামলায় প্রাণ হারাতে হয় ২০ জনকে।

নিহতের তালিকায় ছিলেন ওই সময় শহরের আলোচিত ছাত্রলীগ নেতা সাইদুল হাসান বাপ্পী, তোলারাম কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস আকতার হোসেন, সংগীতশিল্পী মোশাররফ হোসেন মশু ও নজরুল ইসলাম বাচ্চু, আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন ভাসানী, এবিএম নজরুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সাইদুর রহমান সবুজ, মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী পলি বেগম, কবি শওকত হোসেন মোক্তার, চা দোকানি হালিমা বেগম, যুবলীগ কর্মী নিধু রাম বিশ্বাস, রাজিয়া বেগম, আব্দুস সাত্তার, এনায়েতউল্লাহ স্বপন, স্বপন রায়।

শামীম ওসমান ছাড়াও ওইদিন গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় আওয়ামী লীগ নেতা চন্দন শীল ও যুবলীগ কর্মী রতন দাস। চন্দন ওই সময় শামীম ওসমানের ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগ আমলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হন।

এ মামলায় ১৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণের কথা গতবছর জানিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) একেএম ওমর ফারুক নয়ন। মামলাটির জন্য ওই বছরের ১ আগস্ট রায়ের তারিখও ধার্য হয়। কিন্তু সেদিন রায় ঘোষণা হয়নি।

মামলার অগ্রগতি জানতে চাইলে সোমবার রাতে রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী বলেন, “মামলাটির রায়ের তারিখ নির্ধারিত হলেও সেটি হয়নি। আদালত রায়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সম্পূরক চার্জশিটের মূল কপি জমা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে তাকে তলব করেছেন। তার সাক্ষ্যও পুনরায় গ্রহণ করা হবে।”

হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে করা মামলা দু’টিতে এখন পর্যন্ত ৩৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তার পুনরায় সাক্ষ্যগ্রহণের পর অন্যান্য বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায়ের দিন নির্ধারিত হবে বলেও জানান তিনি।

এদিকে, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেড় দশক ধরে সরকারে থাকা আওয়ামী লীগের পতন হলে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান। তাদের মধ্যে এ মামলার সাক্ষী ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন।

শামীম ওসমান ও তার সহযোগী নেতা-কর্মীরা ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সশস্ত্র হামলা চালানোর অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত। সপরিবারে শামীম ওসমানও এখন বিদেশে পলাতক।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়