কাজের কথা বলে রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধে, আহত হয়ে ফিরলেন সিদ্ধিরগঞ্জের আদনান
ইলেকট্রিশিয়ান ও নির্মাণশ্রমিকের কাজের কথা বলে রাশিয়ায় নেওয়ার পর সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানোর অভিযোগ করেছেন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের বাসিন্দা মো. আদনান হোসেন (৩০)। ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলে ড্রোন হামলায় আহত হয়ে প্রায় দুই মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর সেখান থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় দেশে ফিরেছেন তিনি।
আদনানের অভিযোগ, একটি এজেন্সির মাধ্যমে কয়েক লাখ টাকা খরচ করে তিনি রাশিয়ায় যান। তাঁর সঙ্গে একই এলাকার আরও দুজনসহ প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশি ছিলেন। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রথমে তাঁদের একটি হোটেলে এবং কয়েক দিন পর একটি সেনা ক্যাম্পে নেওয়া হয়। পরে ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে নিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
প্রায় ২০ থেকে ২২ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে জুন মাসে তাঁদের যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয় বলে দাবি করেন আদনান।
তিনি বলেন, ‘আমরা কমান্ডারকে বলতাম, আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি। আমরা রাশিয়ায় কাজ করতে এসেছি। তখন তারা বলত, আমাদের কোম্পানির কাছ থেকে তাদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তারা কোম্পানিকে টাকা দিয়েছে। তাই আমাদের যুদ্ধ করতেই হবে।’
যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানালে অস্ত্র দেখিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আদনান জানান, সম্মুখসারিতে অবস্থানের কয়েক দিনের মধ্যে তিনি ড্রোন হামলার শিকার হন। তাঁর ভাষ্য, ‘মিনিটে মিনিটে ড্রোন আসত, যুদ্ধ হতো। কোথায় মাইন পাতা আছে, কিছুই বোঝা যেত না। যেখানে-সেখানে মানুষ মারা যেত।’
ড্রোন হামলার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘ড্রোনটি সরাসরি আমাকে লক্ষ্য করে এসেছিল। আমি পেছনে দৌড় দেওয়ায় সেটি আমার কাছ থেকে পাঁচ থেকে ১০ মিটার দূরে বিস্ফোরিত হয়। যদি আমার ওপর বিস্ফোরিত হতো, তাহলে হয়তো আজ বাংলাদেশে থাকতে পারতাম না।’
হামলায় আহত হওয়ার পর তাঁর পেটে অস্ত্রোপচার করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য মস্কো অঞ্চলের একটি হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে প্রায় দুই মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
আদনানের দাবি, সুস্থ হওয়ার পর তাঁকে আবার যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো হতে পারে এমন আশঙ্কায় সেপ্টেম্বরে একজন রুশ মুসলিম সেনার সহযোগিতায় হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে যান। দূতাবাস তাঁর ট্রাভেল ডকুমেন্টের ব্যবস্থা করে। পরে পরিবারের কেনা টিকিটে দুবাই হয়ে বাংলাদেশে ফেরেন তিনি।
আদনানের দাবি, তাঁর সঙ্গে রাশিয়ায় যাওয়া প্রায় ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ১৭ থেকে ২০ জন যুদ্ধে মারা গেছেন। কেউ আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং কেউ এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একই এলাকার মম ও রবিন হোসেন এবং তাঁর প্রশিক্ষণ দলের যশোরের মিন্টু ও ময়মনসিংহের আল মামুন রয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সেনা ক্যাম্পে নেওয়ার পর তাঁদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। ফলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ ছিল না। অন্যদিকে এজেন্সির পক্ষ থেকে পরিবারকে জানানো হতো, তাঁরা ভালো আছেন এবং কাজ করছেন।
আদনান বলেন, ‘আমরা কোথায় আছি, ফ্রন্টলাইনে আছি নাকি বেঁচে আছি—পরিবারের কেউ জানত না। আমি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তারা বিষয়টি জানতে পারে।’
রাশিয়ায় যেতে প্রায় আট লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান আদনান। এর মধ্যে এখনো চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি সৌদি আরবে কাজ করার সময় জমানো অর্থও তিনি খরচ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘রাশিয়া যাওয়ার পর এক টাকাও বাড়িতে পাঠাতে পারিনি।’
আদনানের অভিযোগ, আহত বাংলাদেশিদের প্রাপ্য অর্থ, বেতন ও ইনস্যুরেন্সের অর্থও তাঁরা পাননি। সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ওই অর্থ নিয়ে পালিয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় পাঠানোর ক্ষেত্রে ‘জাবাল এজেন্সি’ ও ‘আরএস ইন্টারন্যাশনাল’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করেন আদনান। তাঁর দাবি, আরএস ইন্টারন্যাশনালের লাইসেন্স বাতিল করা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হয়নি। এছাড়া রাশিয়ায় ‘প্রো টেকনোলজিস প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের যে প্রতিষ্ঠানে কাজ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, সেখানে গিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের কোনো কারখানা বা কার্যক্রম তাঁরা দেখতে পাননি বলে দাবি করেন তিনি।
তবে আদনানের এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এজেন্সি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
আদনান জানান, তাঁর পরিচিত আরও একজন বাংলাদেশি ড্রোন হামলায় আহত হয়ে বর্তমানে মস্কোতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁর পায়ে ড্রোনের অংশ ঢুকে গেছে বলে জানান তিনি।
দেশে ফেরার পরও চিকিৎসা পুরোপুরি শেষ হয়নি আদনানের। যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কারণে ঘুমের মধ্যে আতঙ্কিত হয়ে ওঠার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
ঘটনার তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট এজেন্সি ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আদনান বলেন, ‘যারা আমাদের কাজের কথা বলে নিয়ে গিয়ে যুদ্ধের মধ্যে পাঠিয়েছে, তাদের শাস্তি চাই। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং আহত বাংলাদেশিদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করার দাবি জানাচ্ছি।’





































