বক্তাবলীতে আ.লীগ-বিএনপির ‘মাটি কাটা সিন্ডিকেট’ বৈঠকে ডিবির হানা
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বক্তাবলীতে ধলেশ্বরী নদী থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় নেতাদের কথিত ‘মাটি কাটা সিন্ডিকেটের’ বৈঠকে ডিবি পুলিশের হানার অভিযোগ উঠেছে। মাটি কাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেই কথিত সিন্ডিকেট টিকিয়ে রাখতে ৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক কাদির সিপাহীর বাড়িতে বৈঠকের আয়োজন করা হয় বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। তবে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ বলছে, তাদের অভিযানটি ছিল নিয়মিত অভিযানের অংশ; কোনো রাজনৈতিক বৈঠককে কেন্দ্র করে অভিযান চালানো হয়নি।
বুধবার দুপুরে বক্তাবলী ইউনিয়নের সিপাইপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কাদির সিপাহীর বাড়িতে জড়ো হয়েছেন এমন খবরের মধ্যে ডিবির এসআই মিজানের নেতৃত্বে ১২ থেকে ১৫ সদস্যের একটি দল সেখানে অভিযান চালায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ওই বৈঠকে বক্তাবলী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক সামেদ আলী, ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সম্পাদক হাসান আলী, বক্তাবলী ১ নম্বর ওয়ার্ড কৃষক লীগের সহসভাপতি মান্নেক খান, যুগ্ম সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন মেসিসহ ১৪-১৫ জন উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রের আরও অভিযোগ, ওই বৈঠকে বক্তাবলী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম প্রধান, সাধারণ সম্পাদক মো. মতিউর রহমান ফকির, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আকবর আলী সুমন, ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি সলিমউল্লাহ প্রধান জুয়েল, সাধারণ সম্পাদক মীর আলমগীর হোসেন, ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ বাদশা মিয়া এবং বিএনপি নেতা মোহাম্মদ মহসিন মিয়া, আমির হোসেন বেপারী ও মোহাম্মদ দিদার হোসেনসহ আরও কয়েকজন নেতাকর্মীর সংশ্লিষ্টতা ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ডিবির সদস্যরা কাদির সিপাহীর বাড়িতে পৌঁছালে সেখানে থাকা কয়েকজন সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় কয়েকজন নারী ডিবির সদস্যদের সামনে অবস্থান নেন। সেই সুযোগে সামেদ আলীসহ কয়েকজন সেখান থেকে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনাস্থলে যাওয়া ডিবির একাধিক সূত্রের ভাষ্য, সামেদ আলীসহ সেখানে থাকা কয়েকজনকে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে না পারায় তারা সরে যেতে সক্ষম হন।
তবে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বক্তাবলী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম প্রধান। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে আমার বৈঠক আছে—এটি সত্য নয়। কাদির সিপাহী ছাত্রলীগ করেছে, সেটিও আমার জানা নেই।’
এর আগে ধলেশ্বরী নদী থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটার প্রতিবাদ করাকে কেন্দ্র করে এনসিপির এক নেতাকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার প্রতিবাদে এনসিপির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় নদী থেকে মাটি কাটা বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাটি কাটা বন্ধ হওয়ার পর তা পুনরায় চালু করতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন নেতাকে নিয়ে সমন্বিতভাবে তৎপরতা শুরু হয়। কাদির সিপাহীর বাড়িতে বুধবারের কথিত বৈঠকটিও ‘মাটি কাটা সিন্ডিকেট’ সচল রাখার সেই তৎপরতার অংশ বলে তাদের দাবি।
কাদির সিপাহী স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচিত। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে গ্রেপ্তারের পর র্যাব জানিয়েছিল, কাদির বক্তাবলী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক সামেদ আলীর প্রধান সহযোগী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তার বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, হুমকি, চাঁদাবাজি, নাশকতা, হত্যাচেষ্টা ও মারামারিসহ মোট ২৮টি মামলা রয়েছে বলেও সে সময় জানিয়েছিল র্যাব।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে কাদির সিপাহী এখন নিজেকে বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এলাকায় নিজের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন বলেও তাদের অভিযোগ।
এ ছাড়া ২০২২ সালের আগস্টে উত্তর গোপালনগরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সামেদ আলী সমর্থিত কাদির সিপাহী ও তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান শওকত আলী সমর্থিত জাকিরের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের পাশাপাশি দুজন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ১৫ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
এদিকে স্থানীয়দের ‘আওয়ামী লীগ-বিএনপির বৈঠক’ এবং সেই বৈঠককে কেন্দ্র করে ডিবির অভিযানের দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) মো. হাসিনুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে বক্তাবলীতে অভিযান ছিল। সেখানে পরে আমাদের টার্গেটেড দুজনকে আটকও করেছি। তবে এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের বা কোনো রাজনৈতিক বৈঠকের বিষয় জড়িত নয়। আমরা যে দুজনকে আটক করেছি, তাদের একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান থেকে গ্রেপ্তার করেছি।’
‘আওয়ামী লীগ-বিএনপির বৈঠক’-এর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন কোনো বৈঠকের তথ্য ডিবি পুলিশ পায়নি।





































