১২ জানুয়ারি ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২২:২২, ১১ জানুয়ারি ২০২৬

আকিজ সিমেন্টে বিস্ফোরণ: ‘মনে হচ্ছিল যেন ভূমিকম্প’

আকিজ সিমেন্টে বিস্ফোরণ: ‘মনে হচ্ছিল যেন ভূমিকম্প’

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের উইলসন রোডে অবস্থিত আকিজ সিমেন্ট কারখানা। আবাসিক এলাকাটির চারদিকে উচু দেয়ালে ঘেরা সুবিশাল এলাকাজুড়ে রয়েছে কারখানাটির বেশ কয়েকটি স্থাপনা। একটু এগিয়ে পশ্চিম দিকে গেলে শীতলক্ষ্যা নদীর পাশে আকিজ ফ্লাওয়ার মিলের প্রধান ফটক। তার আগেই আকিজ সিমেন্টের টিনসেডের তৈরি প্ল্যাস্টিকের বস্তা প্রস্তুতের জন্য কাঁচামাল গলানোর উৎপাদন কেন্দ্র (প্ল্যান্ট)।

শনিবার সন্ধ্যায় এ উৎপাদন কেন্দ্রটির ‘হিট এক্সচেঞ্জার মেশিন’ বিস্ফোরিত হয়ে অন্তত আটজন আহত হন। তাদের সাতজনকে রাতেই প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্ল্যাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।

আহতরা হলেন: মো. হারুন (৪৩), খোরশেদ (২৯), রাকিবুল ইসলাম (২৫), মো. মঞ্জু (২৮), মো. তারেক (২১), ফেরদৌস আলম (৩০), মো. বাবুল (২৯)। তবে, অপর আরেকজনের নাম পাওয়া যায়নি।
আহতদের মধ্যে হারুনের শরীরের ১৪ শতাংশ, খোরশেদের ১২ শতাংশ, রাকিবুলের ১০ শতাংশ, মঞ্জুর ৭ শতাংশ, তারেকের ৪ শতাংশ, ফেরদৌসের ২ শতাংশ এবং বাবুলের ২ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে বলে জানান ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান।

উইলসন রোডে সিমেন্ট কারখানাটির বিপরীত পাশে সাইদুর রহমান বিপ্লবের ছোট মুদির দোকান।

শনিবার সন্ধ্যায় যখন আকিজ সিমেন্ট কারখানার ভেতরে বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটে তখন দোকানেই ছিলেন বিপ্লব। কয়েক মিটার দূরত্বে থাকা এ দোকানির ভাষ্য, বিস্ফোরণের শব্দ ছিল বিকট। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার মনে হয়েছে ‘ভূমিকম্প’।

“বহু কারখানায় এই ঘটনা ঘটে। কিন্তু এই রকম বিকট শব্দ আমি প্রথম শুনছি। মনে হচ্ছিল যেন ভূমিকম্প। এলাকা সুদ্ধা কাঁপতেছিল”, বলছিলেন বিপ্লব।

একই কথা জানালেন ওই এলাকার আরও দু’জন ব্যবসায়ী। তাদের একজন হার্ডওয়ার পণ্য বিক্রেতা রাহিন বলেন, “আমি তখন ছিলাম ফরিদপুর। বাড়ির মানুষ আমাকে ফোন দিয়ে বলতেছিল, ভূমিকম্প হইছে। ভয় পেয়ে গেছেন তারা। পরে আমি এলাকায় ফোন দিয়ে জানতে পারি, আকিজে বিস্ফোরণ হইছে।”

রোববার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত স্থানীয় অন্তত দশজন বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ ও কারখানার কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন এ প্রতিবেদক। তাদের ভাষ্য, সন্ধ্যা সাতটার পর কারখানাটির ভেতরে বিকট শব্দে এই বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটে। কিছুক্ষণ পরেই দগ্ধ শরীর নিয়ে কয়েকজনকে বের হতেও দেখেন স্থানীয়রা।

কারখানাটির কাঁচামাল গলিয়ে সিমেন্ট প্যাকেটজাত করতে প্ল্যাস্টিকের বস্তা তৈরির উৎপাদন কেন্দ্রে ‘হিট এক্সচেঞ্জার মেশিন’ বিস্ফোরিত হয় বলে জানান বন্দর ফায়ার স্টেশনের স্টেশন অফিসার সঞ্জয় খান। এ মেশিন থেকে উচ্চতাপ পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিচালন করে কাঁচামাল গলানো হয়।

প্রাথমিক তদন্তের বরাতে তিনি বলেন, “উচ্চ তাপ ও চাপের কারণে গ্যাস সিলিন্ডারের মতো মেশিনটি বিস্ফোরিত হয়। এতে স্থাপনাটির কাঁচের জানালাও ভেঙে যায়।”

যদিও ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয় ৮টা ৫ মিনিটে, ঘটনার বেশ কিছুক্ষণ পর। ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে ফায়ার টিমের সময় লাগে মাত্র ৫ মিনিট। যদিও সেখানে গিয়ে কোনো আগুন পাননি বলে জানান সঞ্জয় খান।

“আগুনের মাত্রা ও স্থায়িত্বকাল বেশি না হওয়াতে তাদের নিজস্ব অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলে কারখানা কর্তৃপক্ষ। আমরা সেখানে কোনো ভিক্টিম পাইনি। আগেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।”

আটটার পর কারখানা কর্তৃপক্ষের ফোন পান বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিন। তিনি বলেন, “হিট (এক্সচেঞ্জার) মেশিন ব্লাস্ট হইছে বলে জানান তারা (কারখানা কর্তৃপক্ষ)। এবং এই ঘটনার পর অনেক লোকজন কারখানার সামনে জড়ো হইছে, এমন খবর পেয়ে পরে পুলিশ পাঠানো হয় সেখানে।”

“কাঁচামাল ব্যবহার করে যেখানে প্ল্যাস্টিকের বস্তা বানানো হয় সেই মেশিনটি ব্ল্যাস্ট হয়েছে। ওই মেশিনের ভেতরে যে গরম তেল থাকে, তা ছিটকে শ্রমিকদের গায়ে পড়ে। তীব্র শব্দে ওই ফ্লোরের কাঁচের জানালাগুলো ফেটে যায়। এতেও লেবাররা আঘাতপ্রাপ্ত হন।”

কারখানাটিতে কর্মীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক এ প্রতিবেদককে বলেন, “যদি সেফটি জ্যাকেট, গ্ল্যাভস পরাই থাকতো, তাইলে মানুষগুলা পুড়লো কেমনে! এই ফ্যাক্টরির অনেক অভিযোগ আগেও উঠেছে। দুর্ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এইটা নিয়া কেউ আপনারে মুখ ফুইটা কিছু বলবো না। কারণও আপনাদের জানা আছে।”

যদিও কারখানাটির উপ-ব্যবস্থাপক (ডেপুটি ম্যানেজার) নাজমুল হোসেনের দাবি, সবধরনের ‘নিরাপত্তা সরঞ্জাম’ তাদের কারখানাটিতে রয়েছে। যা কর্মীরা সবসময়ই ব্যবহার করে থাকেন।

এটিকে ‘দুর্ঘটনা’ উল্লেখ করে এ কর্মকর্তা মুঠোফোনে বলেন, “আমরা শুরু থেকেই আহতদের চিকিৎসাসহ সবধরনের বিষয়গুলো ক্লোজলি মনিটর করছি। ইতোমধ্যে দুইজন সুস্থ হয়ে উঠেছেন বলেও ডাক্তার জানিয়েছেন”, মুঠোফোনে বলেন ওই কর্মকর্তা।

পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা কারখানার উৎপাদন কেন্দ্রটিতে ছিল কিনা জানতে চাইলে বন্দর থানার ওসি আশরাফ উদ্দিন বলেন, “ওই প্ল্যান্টে তেল গরম করে কাঁচামাল গলানো হয়। কারখানার লোকজন জানিয়েছে, ‘সেখানে সব কাজ অটোমেটিক হয়, লেবার তেমন লাগে না। কেবল কাঁচামাল গলানোর পর বস্তা বানানোর সুতাটি টেনে বের করেন কর্মীরা।’ সেফটি ব্যবস্থা ঠিকমতো ছিল কিনা তা আহতদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাবে। কিন্তু এখনো কথা বলতে পারিনি। তবে, আগামীতে এই বিষয়ে আরও সচেতন থাকার কথা কারখানা কর্তৃপক্ষকে আমরা বলেছি।”

দুপুর দেড়টার দিকে কারখানাটিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকটি বন্ধ। ভেতরে অবস্থান করছেন কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মী। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শনিবার সন্ধ্যার ওই ঘটনার পর কারখানাটির উৎপাদনসহ সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ।

এ সময় লোড-আনলোডের কাজের জন্য আসা দু’জন শ্রমিককেও ভেতরে ঢুকতে না পারায় রাস্তায় অপেক্ষমান পাওয়া যায়। তাদের একজন নূর আলম জিসান বলেন, “আমরা গাড়ি নিয়া আসছি লোড-আনলোড করতে। কিন্তু আমরা তো জানি না, এইসব। এখন বলতেছে ভেতরে ঢোকা যাইবো না।”

সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার জন্য ভেতরে ঢুকতে চাইলে ‘অনুমতি দেওয়ার মতো’ কোনো কর্মকর্তা নেই বলে জানান একজন নিরাপত্তা কর্মী। দায়িত্বপ্রাপ্ত কারো নম্বরও দিতে চাইলেন না। বরং স্থানীয় কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা আবুল কাউসার আশার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

এই বিএনপি নেতা শনিবার রাতেও ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। সেখানে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করেন।

এ দুর্ঘটনার পর রাতেও প্রধান ফটক পার হতে নিরাপত্তা কর্মীরা বাধা দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীরা।

কারখানাটির অদূরে ব্যক্তিগত কার্যালয়ে কথা হয় আবুল কাউসার আশার সঙ্গে। সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মহানগর বিএনপির এ যুগ্ম আহ্বায়ক বলেন, “যাতে কেউ কোনো বিশৃঙ্খলা না করতে পারে, আহতরা যেন ঠিকভাবে চিকিৎসা পান সেইটা নিশ্চিত করার জন্য আমি সেখানে গিয়েছিলাম। কারণ, নির্বাচনকালীন সময়ে অনেকে বিশৃঙ্খলা করতে পারে।”

“বাংলাদেশের কাজের মানের কথা যদি বলি, কোনো জায়গাতেই ওই ধরনের কিছু মেনটেইন করা হয় বলে আমার মনে হয় না। কিন্তু সেফটি-সিকিউরিটির ব্যাপার আকিজের লোকজনই বলতে পারবে। আমরা আকিজকে বলেছি, আহত এবং আহতদের পরিবারের সদস্যদের পাশে যেন তারা থাকেন।”

এ ঘটনায় থানায় কোনো মামলা বা সাধারণ ডায়েরি হয়নি বলে জানিয়েছেন বন্দর থানার ওসি গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিন। “তবে, ঘটনার বিস্তারিত আমরা ঊর্ধ্বতন অফিসারদের জানিয়েছি। আহত বা আহত পরিবারের কেউ যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা বা কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতির অভিযোগ করেন, সেক্ষেত্রে সেইভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সর্বশেষ

জনপ্রিয়