১০ আগস্ট ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২২:১২, ৯ আগস্ট ২০২৬

‘রাজনৈতিক সচিব’ নাকি ‘ছায়া এমপি’

‘রাজনৈতিক সচিব’ নাকি ‘ছায়া এমপি’

নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনের দু’টিতে সংসদ সদস্যরা- অ্যাডভোকেট আবুল কালাম (নারায়ণগঞ্জ-৫) ও আজহারুল ইসলাম মান্নান (নারায়ণগঞ্জ-৩) তাদের ছেলেকে নিজেদের ‘রাজনৈতিক সচিব’ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। নিয়োগপত্রে তারা বলেছেন- সংসদ সদস্যের নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন কার্যক্রম সমন্বয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় ছেলেরা রাজনৈতিক সচিব হিসেবে তাদের সহযোগিতা করবেন।

রাজনীতি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত সময়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত সহকারী অর্থ্যাৎ পিএস নিয়োগ দেওয়ার রীতি দেখা গেলেও ‘রাজনৈতিক সচিব’ হিসেবে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নারায়ণগঞ্জের দু’জন এমপি তাদের সন্তানদের এ পদে নিয়োগ দিয়েছেন। যদিও আগে এমপিরা তাদের পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। তবে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের ‘ছায়া-এমপি’ হিসেবে কাজ করার বৈধতা দেওয়া হয়েছে। কেননা, এর আগেও এমপির ছেলেদের প্রভাব খাটানোর উদাহরণ দু’টোই রয়েছে। এক্ষেত্রেও রাজনৈতিক সচিব পদের মধ্য দিয়ে প্রভাব বিস্তারের মতো ঘটনার আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক সচিব মূলত এমপির রাজনৈতিক কার্যক্রম সমন্বয় করেন। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, রাজনৈতিক কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ, স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়গুলোতে তিনি এমপিকে সহযোগিতা করেন। অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনী এলাকার রাজনৈতিক বিষয়েও এমপির হয়ে যোগাযোগ রক্ষা করেন।

অন্যদিকে ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) মূলত এমপির দৈনন্দিন দাপ্তরিক ও ব্যক্তিগত কাজের সমন্বয় করেন। বেতনভুক্ত হিসেবে তিনি এমপির সময়সূচি ঠিক রাখা, সাক্ষাৎপ্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিভিন্ন চিঠিপত্র ও কাগজপত্রের সমন্বয়, সরকারি-বেসরকারি অনুষ্ঠানের তথ্য জানানো এবং এমপির দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় সহযোগিতা করা তাঁর প্রধান দায়িত্ব।

ফেব্রুয়ারিতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর মার্চে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাভোকেট আবুল কালাম তার ছেলে মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাউসার আশাকে নিজের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। চারবারের এ সংসদ সদস্যের ছেলে আশা নিজেও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর ছিলেন।

সংসদ সদস্য সংশ্লিষ্ট একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চারবারের সংসদ সদস্য আবুল কালাম প্রবীণ রাজনীতিক। শারীরিক অবস্থার কারণে তিনি সরকারি দপ্তরগুলোতে বিভিন্ন সময় উপস্থিত হতে পারেন না। সংসদীয় এলাকার নানা কাজের নথিপত্র সংগ্রহ ও প্রদানের কাজের সমন্বয়ের সুবিধার্থে আবুল কাউসার আশাকে নিয়োগ দেন তিনি।

এ নিয়োগের পর আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাসহ একাধিক সরকারি ও পেশাজীবী সংগঠনের সভায় সংসদ সদস্য বাবার অবর্তমানে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। সরকারি দপ্তরগুলোতেও তাকে ‘রাজনৈতিক সচিব’ পদের মর্যাদায় গুরুত্বপূর্ণ আসনও দেওয়া হয়েছে।

এ নিয়োগের পর ৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান তার ছেলে সাবেক যুবদল নেতা খাইরুল ইসলাম সজিবকে নিজের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।

এ নিয়োগের বিষয়ে অবগতির অনুলিপি জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার, র‌্যাব-১১ ও বিজিবি-৬২ ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক এবং উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

আজহারুল ইসলাম মান্নান স্বাক্ষরিত এ নিয়োগপত্রে বলা হয়েছে- সজিব তার সংসদ সদস্য বাবাকে নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন কার্যক্রম সমন্বয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় সহায়তা প্রদান করবেন।
খাইরুল ইসলাম সজিব জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে তিনি জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হন। গত ২১ জুন দুপুরে রাজধানীর নিজ বাসা থেকে তাকে আটক করে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। পরে তাকে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আনা হয়।

ওই সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী সাংবাদিকদের বলেন, চাঁদাবাজির একাধিক অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে আটক করা হয়েছে। যদিও জিজ্ঞাসাবাদের পরে মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় খাইরুল ইসলাম সজিবকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।

কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার আগেই জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি জেলা কমিটির পদ থেকে সজিবকে বহিষ্কার করে।

এবার তিনি সংসদ সদস্য বাবার রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ পেলেন।

যদিও এ পদে নিয়োগ পাওয়ার আগেই সজিব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভা ও উন্নয়ন সমন্বয় সভায় অংশ নিয়েছেন। এসব সভায় বক্তব্য দেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যের সব বার্তাও ছেলের মাধ্যমেই স্থানীয় প্রশাসন পেয়ে আসছে।

রাজনীতি সচেতন অনেকে বলছেন, রাজনৈতিক সচিব হিসেবে বেতন-ভাতা কিংবা অন্যান্য সুবিধা তারা পাবেন না ঠিকই। কিন্তু এই নিয়োগের মাধ্যমে তাদের কার্যত ‘ছায়া এমপি’ হিসেবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে- এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়