০৭ মার্চ ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৬:২৭, ৬ মার্চ ২০২৬

আপডেট: ১৬:৩৭, ৬ মার্চ ২০২৬

এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিনের সামনে কঠিন পথ

এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিনের সামনে কঠিন পথ

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা ও মূল শহর সংলগ্ন শিল্প অধ্যুষিত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৪ সংসদীয় আসন। দীর্ঘদিন ধরে এ আসন সন্ত্রাস, মাদক, কিশোর গ্যাং, ভূমিদস্যুতা, শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক সহিংসতা ও শ্রমিক অসন্তোষসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। এর সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, চলমান মেগা প্রকল্পের কারণে সৃষ্ট অব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংকট। এমন প্রেক্ষাপটে সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল্লাহ আল আমিনের সামনে কঠিন পথ অপেক্ষা করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন নারায়ণগঞ্জের ‘গডফাদার’ খ্যাত শামীম ওসমান। প্রায় দেড় দশক ধরে তিনি এলাকাটির রাজনীতি ও প্রভাবশালী খাতগুলো নিয়ন্ত্রণ করেছেন। নানা সমস্যাকে সামনে রেখে রাজনীতি হলেও বাস্তবসম্মত সমাধানে তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন নেতৃত্ব হিসেবে উঠে আসা তরুণ সাংসদ আব্দুল্লাহ আল আমিনের প্রতি ভোটারদের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশা, তিনি তাদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ উপলব্ধি করে সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন—ফতুল্লা, কুতুবপুর, বক্তাবলী, কাশীপুর, এনায়েতনগর, গোগনগর ও আলীরটেক নিয়ে গঠিত এ সংসদীয় আসন। এর মধ্যে রয়েছে ধলেশ্বরী নদীঘেঁষা কৃষিভিত্তিক চরাঞ্চল, ফতুল্লা বিসিক শিল্পাঞ্চল এবং নারায়ণগঞ্জ শহরের একটি বড় অংশ। নানা বৈচিত্র্যে গঠিত এই আসন রাজনৈতিকভাবে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সমস্যাবহুলও।

আসনটির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা। ফতুল্লা বিসিক শিল্পাঞ্চল ছাড়াও ফতুল্লা, কুতুবপুর, কাশীপুর ও এনায়েতনগর ইউনিয়নজুড়ে রয়েছে ছোট-বড় হোসিয়ারি, ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানা। ফতুল্লায় রয়েছে একাধিক জ্বালানি তেলের ডিপো, রি-রোলিং মিল এবং ঢাকা-সংলগ্ন এলাকায় ইট, বালু ও পাথরের ব্যবসা। এসব ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, দখল ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সহিংসতা ও রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

এ আসনে শ্রমিক অসন্তোষও প্রায় নিয়মিত ঘটনা। অনেক সময় তা সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ কিংবা শিল্পকারখানায় ভাঙচুরের মতো ঘটনাও ঘটায়। এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রায়ই সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়।

তবে এ ক্ষেত্রটি আব্দুল্লাহ আল আমিনের জন্য আরও কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ ফতুল্লা এলাকার সাংসদ হলেও বিসিক শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব একটা সুসম্পর্কপূর্ণ নয়। ব্যবসায়ীদের প্রধান সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের সঙ্গে তার প্রকাশ্য বিরোধ রয়েছে। গত ৩ মার্চ বিসিকে অনুষ্ঠিত একটি ইফতার মাহফিলে হাতেমকে ঘিরে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে সেখানে তাকে প্রায় দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল।

শিল্প অধ্যুষিত হওয়ায় এ অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি এবং বিপুল সংখ্যক ভাসমান মানুষের বসবাস রয়েছে। ফলে সাতটি ইউনিয়নজুড়েই সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিস্তার রয়েছে। অনেক এলাকায় হাত বাড়ালেই মাদক পাওয়া যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ছিনতাই, সামান্য ঘটনায় সংঘর্ষ এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটছে প্রায়ই। এসব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। অতীতে এসব কার্যক্রম আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে অনেক এলাকায় বিএনপি-সমর্থিত প্রভাবশালী গ্রুপগুলো প্রভাব বিস্তার করেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন দল এনসিপির সংসদ সদস্য হিসেবে এসব নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে ইতোমধ্যে একটি প্রভাবশালী মহল আব্দুল্লাহ আল আমিনকে বিতর্কিত করতে মাঠে নেমেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে তাকে ঘিরে নেতিবাচক প্রচার চালানো হচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নানা বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এনসিপির উত্থান এবং তরুণ এই সংসদ সদস্যের সক্রিয় ভূমিকার কারণে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলো তাকে চাপে রাখতে এমন প্রচেষ্টা চালাতে পারে।

অন্যদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও অনুন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন ফতুল্লা এলাকার বাসিন্দারা। বিশেষ করে মুসলিম নগর, দাপা ইদ্রাকপুর, রেলস্টেশন রোড, ইসদাইর, মাসদাইর, ধর্মগঞ্জ, হাজিবাড়ি, উকিলবাড়ি, লালখা, লালপুর, শিয়াচর, সস্তাপুর ও রামারবাগ এলাকায় প্রায় সারা বছরই জলাবদ্ধতা দেখা যায়। বর্ষা মৌসুমে অনেক রাস্তা চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

স্থানীয়দের মতে, এ দুর্ভোগের অন্যতম কারণ সিদ্ধিরগঞ্জের ডিএনডি প্রকল্প। জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে নেওয়া এ প্রকল্পের কারণে ফতুল্লার একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন পানির নিচে রয়েছে। শিয়াচর এলাকার বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম বলেন, “আগে জানতাম আমাদের এলাকাগুলো ডিএনডি প্রকল্পের আওতায়। এখন শুনছি প্রকল্পের বাইরে। কিন্তু প্রকল্পের কারণে পাশের এলাকা উঁচু হয়ে গেছে, আর আমরা নিচু হয়ে পড়েছি। ফলে সারা বছর পানির মধ্যেই বসবাস করতে হয়।”

এ ছাড়া ২০২১ সালে শুরু হওয়া পঞ্চবটি-মুক্তারপুর দ্বিতীয়তল সড়ক প্রকল্পের কাজ এখনো চলমান। কুতুবপুর, কাশীপুর ও গোগনগর ইউনিয়ন হয়ে চলা এ প্রকল্পের কারণে স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে।

এদিকে কুতুবপুর, বক্তাবলী, কাশীপুর, এনায়েতনগর, গোগনগর ও আলীরটেক ইউনিয়নের অনেক এলাকা এখনো কৃষিভিত্তিক ও অনুন্নত। বিশেষ করে বক্তাবলী, আলীরটেক ও চরকাশীপুর এলাকার বাসিন্দারা শহর থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন। অনেক স্থানে এখনো নৌকা ও বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করে চলাচল করতে হয়। রাতের বেলায় এসব এলাকা অনিরাপদ হয়ে পড়ে।

দীর্ঘদিনের এই সমস্যায় অতিষ্ঠ ফতুল্লাবাসী পরিবর্তন চান। তাই বিভিন্ন প্রভাবশালী প্রার্থীর মধ্যেও তারা তরুণ নেতা আব্দুল্লাহ আল আমিনকে নির্বাচিত করেছেন। তবে শিল্পাঞ্চলের প্রভাবশালী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ এবং অবকাঠামোগত সংকট—সব মিলিয়ে তার পথ সহজ নয়। এখন দেখার বিষয়, তরুণ এই সংসদ সদস্য কতটা কৌশল, দূরদর্শিতা ও সমন্বয় ক্ষমতা দিয়ে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারেন।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়