১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ:

প্রকাশিত: ১৯:৩১, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ১৯:৩৩, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

‘হেভিওয়েটদের’ হারিয়ে আব্দুল্লাহ আল আমিনের বাজিমাত

‘হেভিওয়েটদের’ হারিয়ে আব্দুল্লাহ আল আমিনের বাজিমাত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সদরের আংশিক) আসনে ঘটেছে বড় চমক। একাধিক পরিচিত ও প্রভাবশালী প্রার্থীকে পেছনে ফেলে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সমর্থিত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির তরুণ প্রার্থী এড.আব্দুল্লাহ আল আমিন। ভোট বিভাজনের জটিল সমীকরণে সংগঠিত প্রচারণা ও জোটসমর্থনই শেষ পর্যন্ত তাকে বিজয়ের পথে এগিয়ে দেয় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

এই আসনে মোট ভোটার ছিল ৫ লাখ ৪০ হাজার ৮১৩ জন। এর মধ্যে ৪৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ, অর্থাৎ ২ লাখ ৬৯ হাজার ৮৮ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। এই ভোটের মধ্যে বৈধ ছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৭২৯টি এবং বাতিল হয় ৬ হাজার ৩৫৯টি ভোট।

বৈধ ভোটের হিসাবে আব্দুল্লাহ আল আমিন পেয়েছেন সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সমর্থিত জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থী মনির হোসাইন কাসেমী পেয়েছেন ৮০ হাজার ৬১৯ ভোট। বিএনপির সাবেক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. শাহ আলম পেয়েছেন ৩৯ হাজার ৫৮৯ ভোট। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন পেয়েছেন ৪ হাজার ৭৭৯ ভোট। বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী পেয়েছেন ১১ হাজার ৩২৮ ভোট।

নির্বাচনের আগের দিনগুলোতে এই আসনের রাজনীতি ছিল বেশ আলোচিত। দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেতা ভিন্ন ভিন্ন প্রতীকে প্রার্থী হওয়ায় দলটির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক একক কোনো প্রার্থীর পক্ষে কেন্দ্রীভূত হয়নি। এতে ভোট ভাগ হয়ে যায় কয়েকজন প্রার্থীর মধ্যে। আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগান জুলাই অভ্যুত্থানের আলোচিত মুখ আব্দুল্লাহ আল আমিন।

এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী শিল্পপতি মোহাম্মদ শাহ আলম দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর আগে তিনি বিএনপির হয়ে লড়েছিলেন এ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য সারাহ বেগম কবরীর সাথে যেখানে তিনি পরাজিত হন খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে। সেই সাথে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সংগঠন গড়ে তোলায় তার পরিচিতি ছিলো স্থানীয় কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামায় বিএনপির একটি অংশের ভোট তার দিকে যায়। বিশেষ করে ফতুল্লার কয়েকটি এলাকায় ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সামাজিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি ভোট তুলতে সক্ষম হন। তবে তা বিজয়ের পথে নিতে পারনি। 

সেইসাথে আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনও বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে একসময় এই এলাকায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তবে তিনি সে হিসেবে ভোট পেয়েছেন একেবারেই নগণ্য, দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে তার একটি নিজস্ব ভোটব্যাংক ছিল। তবে এবার বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামায় সেই ভোটব্যাংক আর আগের মতো একত্রে তার পক্ষে দাঁড়ায়নি। পুরোনো সমর্থকদের একটি অংশ অন্য প্রার্থীদের দিকে সরে যায়।

আরেক প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী একসময় বিএনপির সংসদ সদস্য ছিলেন। রাজনৈতিক কৌশলে কিং মেকার খ্যাতি নিয়ে রাজনীতিতে পরিচিতি পান তিনি। তবে এই নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির হাতি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। তার আলাদা পরিচিতি থাকলেও নতুন দলের ব্যানারে নির্বাচনে নামায় পুরোনো রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক পুরোপুরি সক্রিয় হয়নি। ফলে ভোটের মাঠে তার প্রাপ্ত ভোট সীমিতই থেকে যায়।

অন্যদিকে বিএনপি জোট সমর্থিত প্রার্থী ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মনির হোসাইন কাসেমী ছিলেন এ আসনের  হেভিওয়েটদের মধ্যে একজন। বিএনপির দলীয় সাংগঠনিক শক্তির একটা অংশ শুরু থেকেই তার পক্ষে কাজ করেছেন। ধর্মভিত্তিক ভোটারদের একটি অংশও তার পক্ষে সক্রিয় ছিলো। তবে বিএনপির একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে ভোট ভাগ হয়ে যাওযার কারণে কাল হয়ে দাঁড়ায় কাসেমীর জন্য ফলে তিনি প্রত্যাশিত ব্যবধানে এগোতে পারেননি এবং সম্ভাবনা থাকার পরেও পরাজয় হন তিনি। 

অন্যদিকে আব্দুল্লাহ আল আমিন শুরু থেকেই ওয়ার্ডভিত্তিক গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও পথসভা করে মাঠে সক্রিয় ছিলেন। নির্বাচনের আগেও এলাকায় নিয়মিত যোগাযোগ ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে তার পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে এলাকার নানা সমস্যা সমাধান নিয়ে আশ্বাস ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ভূমিকা রাখায় সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হন। সেই সাথে রয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া তরুণদের ভোট এবং নতুন রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়া ভোটাররা ফলাফলে প্রভাব রাখেন। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামী ও দশদলীয় জোটের সাংগঠনিক সমর্থন এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা তাকে শক্ত ভিত দেয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেকদের মতে এই আসনের ফলাফল নির্ধারণে মূল ভূমিকা রেখেছে ভোট বিভাজন। শাহ আলম, গিয়াসউদ্দিন ও মোহাম্মদ আলীর মতো বিএনপি ঘরানার প্রার্থীদের মধ্যে ভোট ভাগ হয়ে পড়ায় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মনির কাসেমী ভোটের রাজনীতে শক্ত অবস্থান নিতে পারেননি। বিপরীতে সংগঠিত জোটসমর্থন ও ধারাবাহিক মাঠকর্মসূচির কারণে আল আমিন এগিয়ে যান।

সব মিলিয়ে, হেভিওয়েট প্রার্থীদের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভোটের বিভাজন এবং সংগঠিত প্রচারণার সমন্বয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে তৈরি হয় ভিন্ন এক রাজনৈতিক সমীকরণ। সেই সমীকরণেই শেষ পর্যন্ত জয়ী হন তরুণ আল আমিন।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়