নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে
প্রথমবারের মতো নৌকা-ধানের শীষ বিহীন নির্বাচন
রাজধানী ঢাকা লাগোয়া শিল্প ও শ্রমিক অধ্যুষিত ফতুল্লা ও সদর উপজেলার আংশিক নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৪ সংসদীয় আসন। বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই আসনটি বরাবরই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে আসছে। ফলে প্রতি জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই বড় রাজনৈতিক দলগুলো এখানে তাদের প্রভাবশালী প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে থাকে।
কোনো কোনো নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও কখনো এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি যে, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে নৌকা বা ধানের শীষ- দুই প্রতীকের কোনোটিই নির্বাচনে ছিল না। তবে এবার সেই ব্যতিক্রমই ঘটছে। এই প্রথমবার কোনো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে নৌকা ও ধানের শীষ-দুটো প্রতীকই অনুপস্থিত।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম দুই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বর্তমান এলাকাটি ঢাকা-৩১ আসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৮৪ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলা হিসেবে ঘোষিত হলে ফতুল্লা এলাকাটি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন হিসেবে চিহ্নিত হয়।
১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ঢাকা-৩১ (বর্তমান নারায়ণগঞ্জ-৪) আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আফজাল হোসেন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময় বিএনপির প্রতিষ্ঠা হয়নি।
১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই অংশগ্রহণ করে। সে নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী এম এ সাত্তার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
নির্বাচন বর্জন ও অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা
১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করলেও হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের সামরিক সরকারের অধীনে নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। একই কারণে ১৯৮৮ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই নির্বাচন বর্জন করে।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই দলই অংশ নেয়। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৯৬ সালে তিন মাসের ব্যবধানে ষষ্ঠ ও সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভোট বর্জন করলে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আলী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছরের জুনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই অংশ নেয়। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শামীম ওসমান বিজয়ী হন।
অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দুই দল অংশগ্রহণ করে। অষ্টম নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন এবং নবম নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সারা বেগম কবরী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে হওয়ায় বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শামীম ওসমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উভয় দল অংশগ্রহণ করলেও বিএনপি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে নিজস্ব প্রার্থী দেয়নি। তারা জোটের শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমীর জন্য ছেড়ে দেয়। তবে সে ধানের শীষ প্রতীকেই নির্বাচন করেন। কিন্তু ফল ঘোষণার পর ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলে ভোট বর্জনে বিএনপি।
পরে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে হওয়ায় বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি।
ওই বছরেরই জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ সরকার প্রধান শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অর্ন্তর্বতীকালীন সরকার গঠিত হয়।
গত বছরের মে মাসে অর্ন্তর্বতী সরকার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। জুলাই অভ্যুত্থানে সংগঠিত অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। এর আগে ছাত্রলীগের রাজনীতিও নিষিদ্ধ করা হয়।
কেন এবার নেই নৌকা ও ধানের শীষ
জুলাই অভ্যুত্থানের পর অর্ন্তর্বতীকালীন সরকারের অধীনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনেই প্রথমবার নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে নৌকা ও ধানের শীষ- কোনো প্রতীকই থাকছে না।
জুলাই অভ্যুত্থানে সংগঠিত অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। একই সঙ্গে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থীও নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারবে না। কারণ তফসিল ঘোষণার আগেই নির্বাচন কমিশন নৌকা প্রতীক বাতিল করেছে।
অন্যদিকে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলেও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে কোনো প্রার্থী দেয়নি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো এবারও আসনটি জোটের শরিক দলের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে আগের মতো ধানের শীষ প্রতীক দেওয়া হয়নি। কেননা, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের নতুন সংশোধনীতে জোটে থাকলেও নিজ দলীয় প্রতীকে লড়বেন প্রার্থীরা। ফলে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী দলীয় প্রতীক খেজুর গাছ নিয়ে নির্বাচন করছেন।
‘বিএনপিময়’ প্রচারণা ও ভোটারদের দোলাচল
দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতীক না থাকলেও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে প্রভাবশালী ও হেভিওয়েট প্রার্থীর অভাব নেই। যাদের অধিকাংশই বিএনপির সাবেক শীর্ষ নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী ও গিয়াস উদ্দিন। এছাড়া রয়েছেন শিল্পপতি শাহ আলম।
এই প্রার্থীদের অনেকেই স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের ব্যবহার করে প্রচারণা চালাচ্ছেন। কেউ কেউ নিজেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবেও উপস্থাপন করছেন। এ নিয়ে সম্প্রতি শিল্পপতি শাহ আলমের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি জোটের প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমীও বিএনপির নেতা-কর্মীদের নিয়ে প্রচারণায় আছেন।
তারপরও সরাসরি ধানের শীষ নেই আসনটিতে। নেই নৌকাও। দীর্ঘ এক সময়ে জনপ্রিয় এই দুই প্রতীকের একটিও না থাকার প্রভাব পড়েছে ভোটের মাঠে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও এ নিয়ে কানাঘুঁষা রয়েছে।
গত মঙ্গলবার বক্তাবলীর আকবরনগরের জেলে কোরবান আলী খেয়াঘাটে বলছিলেন, “নির্বাচনে এইবার মজা পাইতেছি না। নৌকা তো নাই নাই-ই, ধানের শীষও নাই। আমরা যারা মার্কা দেইখা ভোট দেই তারা পড়ছি ফড়ে। দেহি আহে তো খেজুরও, গিয়াস সাবও আছেন। মাইনষে বুঝতেছে না।”
নৌকা ও ধানের শীষহীন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন যে ভোটারদের মধ্যেও বিভ্রান্তি ও দোলাচল তৈরি করেছে তা স্পষ্ট। এমন বাস্তবতায় স্থানীয় সাধারণ ভোটার মুখে শোনা যাচ্ছে, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে ভোট পড়বে ব্যক্তি-ইমেজে। ভোটারদের সিদ্ধান্ত তাই আগেভাগে অনুমান করা যাচ্ছে না। ফলফলই বলে দেবে, কেমন হলো আসনটিতে নির্বাচন।





































