০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ:

প্রকাশিত: ২০:৩২, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

কালামের প্রচারণায় উপেক্ষিত বিএনপির হেভিওয়েট নেতারা

কালামের প্রচারণায় উপেক্ষিত বিএনপির হেভিওয়েট নেতারা

সদর ও বন্দর নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। তিনবারের সংসদ সদস্য হলেও এবার তার সামনে চ্যালেঞ্জ অনেকটা সহজ নয়। তাকে কেবল জামায়াত নেতৃত্বাধীন দশ দলীয় জোটের প্রার্থীকেই নয় স্বতন্ত্র এক দাপুটে প্রার্থীকেও মোকাবেলা করতে হচ্ছে। ভোটের মাঠের সমীকরণে যখন দোদুল্যমান অবস্থায় আবুল কালাম তখন সদর ও বন্দরের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকে দেখা যাচ্ছে না তার পাশে। তবে, ওই নেতাদের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, তাদের ডাকছেন না আবুল কালাম। স্থানীয়ভাবে হেভিওয়েট এবং ভোট-ভিত্তি ধরে রাখা নেতারা উপেক্ষিত হয়ে আসছেন। এ আচরণে মনক্ষুন্ন অনেকে কালামের সঙ্গে না ভিড়লেও ধানের শীষের পক্ষে প্রচারণা ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ নেতাদের তালিকায় আছেন মহানগর বিএনপি নেতা ও সমাজসেবক মাসুদুজ্জামান মাসুদ, মহানগর বিএনপির তিন যুগ্ম আহ্বায়ক আতাউর রহমান মুকুল ও আব্দুস সবুর খান সেন্টু, আনোয়ার হোসেন আনু, মহানগর বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত হাশেম শকু, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপি নেতা জাকির খান, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেত্রী আফসানা আফরোজ বিভা হাসান ও স্বেচ্ছাসেবক দলের মহানগরের আহ্বায়ক সাখাওয়াত ইসলাম রানা।

এ প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে মাসুদুজ্জামান অন্যতম, যিনি শুরুতে আসনটিতে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। পরে নিজে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলে দল প্রার্থী বদলায় এবং আবুল কালামকে মনোনীত করে। তরুণদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয় মাসুদুজ্জামানের বিএনপির তৃণমূলে শক্তিশালী প্রভাবের পাশাপাশি ব্যবসায়ী অঙ্গণে রয়েছে বেশ গ্রহণযোগ্যতা। শিক্ষা ও ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে ভূমিকা রাখা এ রাজনীতিক সমাজসেবক হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন।

আসনটিতে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হওয়ার পরই আবুল কালামের বাড়িতে ছুটে যান মাসুদুজ্জামান। তার সহযোগিতা কামনা করেন। এবং পরে প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর পরও আবুল কালামকে সমর্থন দিয়ে ধানের শীষকে জয়ী করতে অনুসারী নেতা-কর্মীদের সরাসরি নির্দেশনা দেন। কিন্তু এরপরও আবুল কালাম তাকে কোনো কর্মসূচিতে আহ্বান জানাননি। যদিও তার অনুসারী নেতা, কর্মী ও সমর্থকরা নিয়মিত ধানের শীষের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

একই ঘটনা ঘটেছে আতাউর রহমান মুকুলের ক্ষেত্রেও। বন্দর উপজেলা পরিষদের একাধিকবারের চেয়ারম্যান মুকুল অ্যাডভোকেট আবুল কালামের ভাই। বন্দরে বড় একটি ভোট-ভিত্তি ধরে রাখা মুকুল বিএনপির তৃণমূলেও বেশ প্রভাব রাখেন। কিন্তু কালাম কিংবা তার পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত মুকুলকে নিয়ে কোনো আহ্বান আসেনি। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কালাম পরিবারের সঙ্গে মুকুলের অনেকদিন ধরেই সম্পর্কের টানাপোড়ন চলছে। গণঅভ্যুত্থানের পর নানা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সম্পর্কের দূরত্ব আরও বেড়েছে। কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে পারিবারিক সম্পর্কের জের ধরে হলেও তার উন্নতি করার সুযোগ ছিল। যা প্রার্থী হিসেবে আবুল কালামের পক্ষ থেকেই আহ্বানটা আসার কথা ছিল বলে জানাচ্ছেন বিএনপির তৃণমূলের কর্মীরা। কিন্তু তা হয়নি। ফলে কালামের সঙ্গে প্রচারে এখন পর্যন্ত আতাউর রহমান মুকুলকে দেখা যায়নি।

বিএনপি নেতারা বলছেন, একই ঘটনা ঘটেছে আরেক প্রবীণ নেতা আব্দুস সবুর খান সেন্টুর সঙ্গেও। তিনি এক সময় ছিলেন আবুল কালাম শিবিরে। কিন্তু নানা কারণে তাকে দলের মধ্যে কোনঠাসা করে দেওয়া হয়। এ নির্বাচনকে সামনে রেখেও কালাম শিবিরে উপেক্ষিত আব্দুস সবুর খান সেন্টু।

মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন আনুও উপেক্ষিত কালামের প্রচারণায়। কিন্তু তিনি ধানের শীষের প্রচারে আগেও যেমন ছিলেন গত কয়েকদিনও প্রচারে তাকে দেখা গেছে। কিন্তু কালামের সঙ্গে তাকে দেখা যাচ্ছে না। এর পেছনে কারণ হিসেবে তার অনুসারীরা দাবি করছেন, কালামের পক্ষ থেকে তাদের ডাকা হচ্ছে না। তারপরও তারা দলের স্বার্থে দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে কাজ করে যাচ্ছেন।

সাবেক সিটি কাউন্সিলর বিএনপি নেতা শওকত হাশেম শকুও স্থানীয়ভাবে বেশ প্রভাব বিস্তার করেন। তার অনুসারী কর্মী বাহিনীও রয়েছে। কিন্তু তিনিও ধানের শীষের প্রার্থীর সরাসরি আহ্বান পাননি। যদিও তিনি প্রচারে আছেন ধানের শীষের।

শহরে বিএনপির নারী নেত্রীদের মধ্যে আলোচিত নাম আফসানা আফরোজ বিভা হাসান। তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে একাধিকবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। ছিলেন প্যানেল মেয়রও। নারী ভোটারদের মাঝে তো বটেই স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীর মধ্যেও তার আলাদা গ্রহণযোগ্যতা আছে। কিন্তু এই নারী জনপ্রতিনিধিকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জোটের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী আমন্ত্রণ জানালেও আবুল কালাম শিবির তাকে ডাকেনি। ফলে তাকেও দেখা যাচ্ছে না কালাম পরিবারের সঙ্গে কোনো প্রচারে।

কালামের প্রচারণায় উপেক্ষিত তালিকায় আছেন সাবেক ছাত্রনেতা জাকির খান। জাকির খান নেতৃত্ব দিয়েছেন ছাত্রদলে। এখনো তার বেশ প্রভাব রয়েছে সদর ও বন্দর এলাকায়। তার বিশাল কর্মী-বাহিনী ভোটের মাঠের সমীকরণ বদলে দিতে সক্ষম। কিন্তু এ হেভিওয়েট নেতাকেও কাছে ডাকেননি কালাম, দাবি তার অনুসারীদের।

উপেক্ষিত থেকে গেছেন মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দেওয়া সাখাওয়াত ইসলাম রানাও। শহরের উত্তরপাড়ার আধিপত্য ধরে রাখা পরিবারের সদস্য এ নেতাও কালামের প্রচারণায় নেই। অনেকে বলছেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের শুরুর দিকের নেতৃত্ব দেওয়ার সময় কালামপুত্র আবুল কাউসার আশার সঙ্গে নেতৃত্ব নিয়ে বৈরিতা এখনো কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ নেয়নি ধানের শীষের প্রার্থী। ফলে বিপুল কর্মী-বাহিনী থাকা রানাও নেই সরাসরি কালামের কোনো প্রচারে।

বিএনপি নেতারা বলছেন, সদর-বন্দরে ত্যাগী ও প্রবীণ নেতাদের মূল্যায়ন করছেন না ধানের শীষের প্রার্থী। অথচ বিগত নির্বাচনগুলোতে এ নেতাদের অনেকেরই ভূমিকা থাকার কারণে বিজয়ীর হাসি হাসতে পেরেছিলেন আবুল কালাম। এবার সঠিকভাবে তারা মূল্যায়িত হচ্ছেন না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান নির্ধারণে তৃণমূলের ঐক্য বড় ভূমিকা রাখবে। হেভিওয়েট নেতাদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছাড়া ভোটের মাঠে পূর্ণ শক্তি নিয়ে নামা কঠিন হতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট অনেকেই এখনো দলীয় প্রতীকের পক্ষে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, যা শেষ মুহূর্তে সমীকরণ বদলে দিতেও পারে। শেষ পর্যন্ত প্রার্থীর সঙ্গে এসব প্রভাবশালী নেতাদের দূরত্ব কমে কি না, সেটিই হয়ে উঠেছে এ আসনের নির্বাচনী রাজনীতির বড় প্রশ্ন।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়