নারায়ণগঞ্জ-৫:
পুরাতনই ভরসা নাকি পরিবর্তনের আভাস?
ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনী মাঠের উত্তাপ ততই বাড়ছে। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনও এর ব্যতিক্রম নয়, বাড়ছে উত্তেজনা। এখন পর্যন্ত ভোটের মাঠের সমীকরণ বলছে, লড়াই হবে প্রভাবশালীদের মধ্যে। নির্বাচনী মাঠে অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও সাবেক জনপ্রতিনিধিদের পাল্লা ভারী হলেও উদিয়মান তরুণ প্রার্থীও রয়েছে যারা নিজ অবস্থান থেকে নানা কৌশল ও প্রচারণায় এগিয়ে যাচ্ছে এবং ভোটারদের নজর কাড়ছেন। তবে ভোটের দিনই বলা যাবে সাধারণ ভোটারদের ভরসা কোথায়- পুরাতনে, নাকি পরিবর্তনে।
শিল্প-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ শহর ও বন্দর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটি রাজনৈতিকভাবে বরাবরই হাই-ভোল্টেজ। ফলে প্রতি নির্বাচনেই রাজনৈতিক দলগুলো আসনটিকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বিশেষ করে প্রভাবশালী ও পরিচিত মুখকে প্রার্থিতা দেওয়ার প্রবণতা বরাবরের। ব্যতিক্রম হয়নি এই নির্বাচনেও। অধিকাংশ প্রার্থীই জনপ্রিয় ও আলোচিত, যার মধ্যে একজন এই আসনের তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের নতুন সীমানা অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১১ থেকে ২৭ নম্বর ওয়ার্ড এবং বন্দর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন- বন্দর, কলাগাছিয়া, মুছাপুর, ধামগড় ও মদনপুর নিয়ে আসনটি গঠিত। যার মোট ভোটার ৪ লাখ ৮০ হাজার ২৮২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪০ হাজার ৮২০ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৩৯ হাজার ৪৫৫ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৭ জন।
এবারের নির্বাচনে মোট ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করলেও বাস্তব লড়াই সীমাবদ্ধ তিনজনেই।
আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। তিনি এ আসনের তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি একজন ক্লিন ইমেজের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে বেশ শক্তিশালী একজন ব্যক্তি। একই সাথে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রভাবও রয়েছে তার। তিনি দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জালাল উদ্দিনের ছেলে। ফলে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটারের মাঝে তার গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। বিশেষ করে বন্দর উপজেলায়। বন্দরকে তার ‘দুর্গ’ বলেও আখ্যায়িত করেন অনেকে।
তবে দলীয় অভ্যন্তরীণ বিভাজন তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাচাতো ভাই, বন্দর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুলসহ স্থানীয় বিএনপির একাধিক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে তার বিরোধ রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কারণে দলের বেশ কিছু শীর্ষ নেতা তার নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় নন, যা তাকে কিছুটা ব্যাকফুটে ফেলেছে।
নির্বাচনের শুরুতে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত না হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন এখন আবুল কালামের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান হয়ে এবার সংসদ সদস্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি। দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে দলটির তৎকালীন সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় বহিষ্কৃত হন তিনি। প্রভাবশালী ওসমান বলয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচন করে ও জয়ী হয়ে তিনি ভোটের মাঠে নিজের সক্ষমতা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছেন। সেই নির্বাচনের কারণে ওসমানবিরোধী ভোটের একটি অংশ এখনো তার সঙ্গে রয়েছে।
এছাড়া বন্দর দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি থাকার সুবাদে তার রয়েছে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা ও মাঠপর্যায়ে নিজস্ব কর্মী বাহিনী। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেমে সুসংগঠিত প্রচারণার মাধ্যমে ভোটের মাঠে জনপ্রিয়তা তৈরি করতে পেরেছেন এই প্রার্থী। বিগত দিনের একাধিক শোডাউন করে তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। যা ভোটের মাঠে তার শক্তি প্রদর্শন করে।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী এবিএম সিরাজুল মামুন খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব। দীর্ঘদিন জেলা পর্যায়ে দলীয় নেতৃত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দল সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তরুণ সমাজের কাছে তিনি ‘মোল্লা মামুন স্যার’ নামে পরিচিত। আশির দশকেই নারায়ণগঞ্জে জনপ্রিয় ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে তার সুপ্রতিষ্ঠিত হন। যা তাকে শিক্ষিত ও তরুণ ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। পাশাপাশি ইসলামীক বক্তা ও ক্লিন ইমেজের এই প্রার্থী নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের ভোটারদের মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছেন এবং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। চিরাচরিত রাজনৈতিকদের বাইরে অনেকেই তাকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
ভোটের সমীকরণ অনুযায়ী, বন্দর উপজেলা অ্যাডভোকেট আবুল কালাম ও মাকসুদ হোসেনের শক্ত অবস্থান থাকলেও শহরের তুলনামূলক কম। বিপরীতে সিরাজুল মামুনের পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা নারায়ণগঞ্জ শহরেই বেশি। ভোটের সমীকরণ অনুযায়ী শহরাঞ্চল থেকেই তিনি উল্লেখযোগ্য ভোট পেতে পারেন তিনি। এছাড়া জোটের প্রার্থী হওয়ায় জামায়াতসহ শরিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা শুরু থেকেই তার পক্ষে সক্রিয়ভাবে মাঠে রয়েছেন। নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। একইসাথে আসনটিতে ইসলামপন্থি দলগুলোর একটি বড় ভোটব্যাংক রয়েছে, যার অধিকাংশই তার ঝুলিতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ইসলামী আন্দোলন জোটের বাইরে থাকায় এই ভোটের পরিমাণ আরও বাড়তে পারত বলে মত রাজনৈতিক মহলের।
চূড়ান্ত সমীকরণে এই তিন প্রার্থীর ভোট কাটবেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী তারিকুল ইসলাম সুজন ও ইসলামী আন্দোলনে প্রার্থী মুফতি মাছুম বিল্লাহ।
তরুণ প্রার্থী তারিকুল ইসলাম সুজন রাজনৈতিক জীবনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ও নাগরিক বিভিন্ন ইস্যুতে সোচ্চার ছিলেন। নির্বাচনী মাঠেও ব্যতিক্রমী প্রচারণার মধ্য দিয়ে ভোটারদের নজর কেড়েছেন। এছাড়া গত জুলাই আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জে তার ও তার দলের নেতাকর্মীদের বিশেষ ভূমিকা ছিল।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন মহানগরের সভাপতি মুফতি মাছুম বিল্লাহ। সজ্জন ব্যক্তি, রাজনীতিবিদ ও ইসলামীক বক্তা হিসেবে শহরে তার সুপরিচিতি রয়েছে। তার সাংগঠনিক দক্ষতার দরুন তৃণমূলে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। একইসাথে আসনটিতে ইসলামী আন্দোলনে নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে। গত সিটি নির্বাচর্নে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে তার সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। নির্বাচনী মাঠে তার ব্যক্তিগত ইমেজ দলীয় ভোটের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী বলে মনে করেন অনেকে।
এছাড়াও আনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন বাংলাদেশ ইসলামীক ফ্রন্ট সৈয়দ বাহাদুর শাহ্ মুজাদ্দেদী, বাসদ আবু নাঈম খান বিপ্লব, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট এইচএম আমজাদ হোসেন মোল্লা, সিপিবি মন্টু চন্দ্র ঘোষ ও গণঅধিকার পরিষদের মো. নাহিদ হোসেন। নিজ নিজ পর্যায়ে ভোটের মাঠে তারাও সোচ্চার ও নিয়মিত প্রচারণা করে যাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের লড়াই এখন ত্রিমুখী হলেও শেষ মুহূর্তে ভোটার উপস্থিতি, দলীয় ঐক্য ও কেন্দ্র ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করেই ফলাফল নির্ধারিত হবে। এই আসনের ফল শুধু একজন সংসদ সদস্য নির্বাচন নয়; বরং নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে যাবে- তারও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেবে। ফলে ভোটাররা পুরোনো অভিজ্ঞদের কাউকে বেছে নিবেন নাকি আনতে চান পরিবর্তন তার উত্তর হবে ব্যালটে।





































