ফলাফল নির্ধারণে ফ্যাক্টর সিদ্ধিরগঞ্জ ও সদরের ভোটাররা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে অবস্থানগত কারনে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সিদ্ধিরগঞ্জ–সোনারগাঁ) ও নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর–বন্দর) আসন। ভোটের রাজনীতিতে এই দুই আসনে তৈরি হয়েছে এলাকাভিত্তিক ভোটের সমীকরণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দুটি আসনের ফলাফল নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে সিদ্ধিরগঞ্জ ও সদর এলাকার ভোটাররা।
নির্বাচন কমিশনের নতুন সীমানা নির্ধারণ অনুযায়ী আগে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের অন্তর্ভুক্ত থাকা সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চল এবার যুক্ত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সঙ্গে। এই পরিবর্তনের ফলে ভোটের ফলে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, নতুন করে যুক্ত হওয়া সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলেই রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার এবং রাজনৈতিকভাবে অঞ্চলটি বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৪৬ জন। এর মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলের ভোটার ২ লাখ ২৬ হাজার ৯৩ জন এবং সোনারগাঁ উপজেলার ভোটার ৩ লাখ ৬৭ হাজার ২৫৩ জন। ভোটার সংখ্যার এই ভারসাম্য আসনটির রাজনৈতিক চিত্রকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছে।
এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান, স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ইকবাল করিম ভূঁইয়া এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী গোলাম মসীহ। তাদের অধিকাংশই সোনারগাঁ এলাকার ভোটার। ব্যতিক্রম হিসেবে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, যিনি সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার ভোটার এবং আগে সিদ্ধিরগঞ্জ নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের অন্তর্ভুক্ত থাকাকালে ওই এলাকার সংসদ সদস্য ছিলেন।
সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় গিয়াস উদ্দিনের শক্তিশালী অনুসারী ও কর্মী-সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। অতীতে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং সাংসদ থাকার সুবাদে এলাকাটিতে তার ব্যক্তিগত প্রভাব এখনো বিদ্যমান। অন্যদিকে আজহারুল ইসলাম মান্নান ও রেজাউল করিম দীর্ঘদিন ধরে সোনারগাঁ অঞ্চলে রাজনীতি করে আসায় সেখানে তাদের আলাদা রাজনৈতিক বলয় রয়েছে। ফলে একাধিক প্রার্থীর মধ্যে ভোট বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় গিয়াস উদ্দিনের প্রভাব থাকলেও বিএনপির কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলীয় নেতা-কর্মীরা আজহারুল ইসলাম মান্নানের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এতে করে ভোটের হিসাব আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তবে সিদ্ধিরগঞ্জে একক প্রার্থী হিসেবে মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন থাকায় আঞ্চলিক ভোটে তিনি সুবিধা পেতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলের ভোট যদি একদিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে তা পুরো আসনের ফলাফল পাল্টে দিতে পারে। সে কারণেই নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে সিদ্ধিরগঞ্জের ভোটাররাই মূল ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
অন্যদিকে সদর এলাকার সিটি কর্পোরেশনের ৮ টি ওয়ার্ড ও বন্দর উপজেলা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনেও লড়াই হবে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৮৫ হাজার ২৮৪ জন। এর মধ্যে সদর উপজেলার ভোটার ২ লাখ ৫৪ হাজার ২০ জন এবং বন্দর উপজেলার ভোটার ২ লাখ ৩১ হাজার ২৬৪ জন।
এই আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন এবং জামায়াত জোট সমর্থিত খেলাফত মজলিসের প্রার্থী এবিএম সিরাজুল মামুন।
আবুল কালাম ও মাকসুদ হোসেন—দুজনেরই বন্দর এলাকায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। আবুল কালাম সাবেক সংসদ সদস্য হওয়ায় বন্দরে রয়েছে তার পারিবারিক রাজনৈতিক ভিত্তি। অপরদিকে মাকসুদ হোসেন বন্দর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান এবং মুছাপুর ইউনিয়নের তিনবারের সাবেক চেয়ারম্যান হওয়ায় এলাকাটিতে তার শক্ত অবস্থান রয়েছে। ফলে বন্দর উপজেলার ভোট বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয় সমীকরণে আবুল কালামের বাস সদর হলেও পৈত্রিক বাড়ি বন্দরে এবং মাকসুদ হোসেনের বাড়িও বন্দরে—দুজন একই এলাকার হওয়ায় বন্দর এলাকায় ভোট ভাগাভাগির সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে সিরাজুল মামুন সদরের বাসিন্দা হওয়ায় সদর এলাকার ভোটে তার সুবিধা হতে পারে।
এই অবস্থায় সদর এলাকার ভোট যে প্রার্থীর পক্ষে বেশি যাবে, তিনিই এগিয়ে থাকবেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ, বন্দর এলাকার ভোট বিভক্ত হলে সদর এলাকার ভোটই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করবে। এ কারণে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী এবিএম সিরাজুল মামুনের পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি মাসুম বিল্লাহসহ অন্যান্য প্রার্থীরাও সদর এলাকার ভোটারদের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে সিদ্ধিরগঞ্জ এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে সদর এলাকার ভোটাররাই দুই আসনের ফলাফল নির্ধারণে চূড়ান্ত ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ফলে এই দুটি এলাকার ভোট প্রবণতার ওপর নির্ভর করেই নির্ধারিত হবে দুই আসনের আগামী দিনের সংসদ সদস্য।





































