০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ:

প্রকাশিত: ২১:৫১, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

নারায়ণগঞ্জ-৩:

জামায়াত ফেরায় সুবিধায় মান্নান

জামায়াত ফেরায় সুবিধায় মান্নান

হাতপাখা বেরিয়ে যাওয়ার পরও ইসলামিক ও সমমনা দশ দলীয় জোটে আসন সমঝোতা হচ্ছিলো না। নানা নাটকীয়তার পর নারায়ণগঞ্জ-৩ (সিদ্ধিরগঞ্জ-সোনারগাঁ) আসনে ভোটের মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা মো. ইকবাল হোসাইন ভূঁইয়া। তার ফেরায় ইসলামপন্থী ও সমমনা দশ দলীয় জোটে প্রকাশ্য ফাটল দেখা দিয়েছে, যা আসনটির ভোটের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। দশ দলীয় জোটের এই ভোট ভাগের সুবিধা কিছুটা হলেও ধানের শীষের প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নানের পক্ষে যাচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

আসনটিতে ভোটের মাঠের সমীকরণে এতটুকু সুবিধা মান্নানকে কতটা এগিয়ে রাখবে তা নির্ধারিত হবে ভোটের দিন। যদিও স্থানীয় বিএনপি নেতা ও মান্নানের ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, তারা ভোটারদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। জয়ের ব্যাপারে তাদের কোনো সন্দেহ নেই।

নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান ছাড়াও দশজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে দু’জন আছেন যারা বিএনপির সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী। তারা হলেন: বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম ও দলটির সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন।

এছাড়াও আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা মো. ইকবাল হোসাইন ভূঁইয়া, গণসংহতি আন্দোলনের অঞ্জন দাস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের গোলাম মসীহ্, জনতার দলের আবদুল করিম মুন্সী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. শাহজাহান শিবলী, আমার বাংলাদেশ পার্টির আরিফুল ইসলাম এবং গণঅধিকার পরিষদের মো. ওয়াহিদুর রহমান মিল্কী নির্বাচনি মাঠে আছেন।

স্থানীয়রা বলছেন, আসনে ইসলামপন্থি একটি বড় ভোটব্যাংক রয়েছে, তবে তা বিভিন্ন দলের মধ্যে বিভক্ত। শুরুতে ইসলামপন্থি ও সমমনা দলগুলোর মধ্যে জোট গঠনের ফলে এই ভোটব্যাংক একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠলেও, মতানৈক্যের কারণে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে বেরিয়ে যায়। এর পরই জোটের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা মো. শাহজাহান শিবলীকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়।

প্রথমদিকে এ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ইকবাল হোসাইন ভূঁইয়া শিবলীকে সমর্থন জানিয়ে নিজের মনোনয়ন প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেন। তবে নির্ধারিত সময়ের পরে আবেদন করায় জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা তা গ্রহণ করেননি। পরে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে শিবলীকে সমর্থনের বিষয়টি পুনরায় স্পষ্ট করেন তিনি।

যদিও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জামায়াত শুরু থেকেই আসনটি ছাড়তে নারাজ ছিল। পরে জোটের স্বার্থে জামায়াতের সমঝোতায় বরং স্থানীয় পর্যায়ে দলটির সমর্থকদের মধ্যে নাখোশ মনোভাব দেখা যায়। ফলে জামায়াতের ভোটের একটি অংশ বিএনপির বিদ্রোহী রেজাউল করিম ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের মধ্যে ভাগ হওয়ার সম্ভবনা তৈরি হয়েছিল। এতে প্রাথমিকভাবে ভাবনায় পড়ে যান মান্নান।

তবে ভোটের এই সমীকরণে নাটকীয় মোড় আসে জামায়াতের প্রার্থী ইকবাল হোসাইন ভূঁইয়ার নির্বাচনী মাঠে ফেরার মধ্য দিয়ে। গত কয়েক দিন ধরে তিনি নিজেকে জোটের প্রার্থী দাবি করে প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। বুধবার জোটের একটি জনসভায় প্রার্থী হিসেবে মঞ্চে উপস্থিত থাকেন তিনি। এতে জোটের শরিকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয় এবং ইসলামপন্থী ও সমমনা দলগুলোর মধ্যে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর পরদিন বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মো. শাহজাহান শিবলী ইকবাল হোসাইন ভূঁইয়াকে ‘অবৈধ প্রার্থী’ বলে মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, “জোটের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে রিকশা প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত জোটের চূড়ান্ত তালিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এর বাইরে কোনো বিকল্প সিদ্ধান্ত বা সংশোধনী এখনো দেওয়া হয়নি। সুতরাং রিকশা প্রতীকই জোটের বৈধ প্রতীক, অন্য সব বক্তব্য ও প্রচার বিভ্রান্তিকর।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের ফলে আসনটির ভোটের সমীকরণ নতুনভাবে বিন্যস্ত হচ্ছে। যে ভোট আগে রেজাউল করিম ও গিয়াস উদ্দিনের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল, ইকবাল মাঠে ফেরায় তা জামায়াতের দাঁড়িপাল্লার দিকেই ফিরে যাচ্ছে। এতে মান্নানের সুবিধা হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

তারা বলছেন, একদিকে ইসলামপন্থী জোটের ভাঙনে ভোটের মাঠের সমীকরণে প্রতিদ্বন্দ্বীরা দুর্বল হচ্ছেন আজহারুল ইসলাম মান্নানের জন্য। অন্যদিকে, দাঁড়িপাল্লা প্রচারে ফেরায় রেজাউল ও গিয়াসের ভোটের সমীকরণ বদলে যাওয়া। দু’টোই পক্ষে গেছে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আজহারুল মান্নানের।

ভোটের সন্নিকটে এসে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলেও মান্নানের জন্য পথটা সহজ হচ্ছে না। কেননা, এ আসনের সমীকরণে শুরু থেকেই পথটা সহজ ছিল না ধানের শীষের প্রার্থীর জন্য। মনোনয়ন পাওয়ার পরই একজোট বিরোধীতা মোকাবেলা করতে হয়েছে। প্রার্থীতা চূড়ান্ত হওয়ার পরও তাকে বিদ্রোহীদের মুখোমুখি হতে হয়। তাছাড়া, আসনটিতে এবার সোনারগাঁয়ের পাশাপাশি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকাটি যুক্ত হয়েছে। দুই অঞ্চলের মধ্যে ফুটবল প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন সিদ্ধিরগঞ্জে একক নিয়ন্ত্রণ রাখেন। তিনি এ এলাকার বাসিন্দা। তিনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে যেবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তখন এলাকাটি ওই আসনে যুক্ত থাকায় সিদ্ধিরগঞ্জে তার ভোটব্যাংকের পরিসংখ্যান বেশ ভালোই বোঝা যায়। আর অন্যদিকে সোনারগাঁ এলাকাতে বাড়ি রেজাউল ও মান্নান দুজনেরই। ফলে, এ অঞ্চলে তাদের ভোট ভাগ হওয়ার সমীকরণ মেলানো সহজ। ফলে মান্নানের নিজ এলাকায় যেমন ভোট বাড়াতে হবে, তেমনি নিশ্চিত করতে হবে সিদ্ধিরগঞ্জে গিয়াসবিরোধী ভোট।

এসব হিসেব-নিকেশ যখন চলছে তখন জামায়াতে ইসলামীর ফের ভোটের মাঠে ফেরা মান্নানকে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিয়েছে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়