ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
নারায়ণগঞ্জে তরুণ ভোটারদের ভাবনা ও আকাঙ্ক্ষা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ ও তাদের রাজনৈতিক মনোভাব। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটারের একটি বড় অংশ তরুণ, যার ফলে এই নির্বাচনে তরুণদের ভোটই ভবিষ্যৎ রাজনীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অভিজ্ঞতা শুধু তরুণদের রাজনীতির প্রতি আগ্রহ বাড়ায়নি, বরং তাদের ভোট প্রদানে যুক্তিনির্ভর ও নীতিভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতাও বাড়িয়েছে।
একই সঙ্গে সামাজিক ও ডিজিটাল মিডিয়ার প্রভাবও তরুণ ভোটারদের মধ্যে স্পষ্ট। তরুণ ভোটাররা খবর, মতামত এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণ অনলাইনে নানাভাবে অনুসরণ করেন এবং মতামতও প্রকাশ করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তরুণদের এই ধারা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়াবে, কারণ শুধুমাত্র প্রচারণার মাধ্যমে তরুণদের মন জয় করা সম্ভব নয়; তাদের আকৃষ্ট করতে হবে কার্যকর পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতার চর্চার মাধ্যমে।
নির্বাচন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নারায়ণগঞ্জের তামিম আহমেদ বলেন, “একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি তাকেই ভোট দেব, যিনি নিজ মতাদর্শের চেয়ে জনগণের মতাদর্শকে বেশি প্রাধান্য দেন, যার কথার সঙ্গে কাজের মিল আছে। তিনি মানুষ হিসেবে কেমন, নির্বাচনী এলাকা পরিচালনায় তার বিচক্ষণতা, জ্ঞান ও দক্ষতা আছে কি না এবং তার পূর্ব কাজের অভিজ্ঞতা কেমন এসব বিবেচনা করব। এমন প্রার্থীকে ভোট দেব, যিনি জনগণের দাবির প্রতি সংবেদনশীল এবং শুধু ভোট চাইতেই নয়, দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
সরকারি তোলারাম কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. শাহরিয়ার সাব্বির বলেন, “জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সব প্রার্থীই তাদের ইশতেহার জনগণের কাছে পৌঁছাতে ব্যস্ত। আমরা আমাদের নির্বাচনী আসনে এমন একজন সংসদ সদস্য চাই, যিনি প্রথমত আমাদের অঞ্চলের যুবসমাজের কারিগরি দক্ষতার দিকে বিশেষ নজর দেবেন এবং স্থানীয় বেকারত্বের দিকেও গুরুত্ব দেবেন। এই শহরের যানজটসহ সামগ্রিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার যোগ্যতা যার রয়েছে, তাকেই আমরা ভোট দিতে চাই। যাকে ভোট দিলে কোনো ক্যাডার বাহিনী গড়ে ওঠার আশঙ্কা থাকবে না, তাকেই ভোট দেব। পাশাপাশি সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার উদ্যোগ যাঁর মধ্যে দেখব, তাকেই আমরা প্রার্থী হিসেবে বেছে নেব।”
সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফতুল্লার ইয়াসিন আরাফাত বলেন, “আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশের সচেতন নাগরিক, বিশেষ করে আমাদের প্রজন্ম জেন-জি একটি স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে। আমরা এমন প্রার্থী চাই, যিনি দুর্নীতি, মাদক চোরাচালান ও সব ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবেন। আমরা আর কোনো ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি চাই না। অতীতের ফ্যাসিবাদী সরকার যেভাবে প্রশাসনকে পুতুলে পরিণত করে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, তার ফলেই দেশ আজ দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়েছে, আর একটি বিশেষ শ্রেণি অবৈধভাবে সম্পদের পাহাড় গড়েছে। যিনি এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কাজ করবেন, তাকেই আমরা ভোট দেব।”
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আফরিন জুঁই বলেন, “নারায়ণগঞ্জের মানুষ নানা হত্যা, দখলবাজি ও ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতিসহ বিভিন্ন অপরাধের শিকার হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। তাই এবার আমরা সঠিক প্রার্থী বেছে নিতে চাই। এমন একজন নেতা বা দলীয় প্রার্থীকে ভোট দেব, যিনি নারীদের কোনো বাধার মুখে না ফেলে স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার নিশ্চিত করবেন এবং কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি করবেন না। পাশাপাশি গণতন্ত্রকে সম্মান করবেন এবং দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নেবেনএটাই আমাদের প্রত্যাশা। আগামী নির্বাচন শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।”
এ বিষয়ে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক ভাবনা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হয়, তবে তা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আরও জবাবদিহিমূলক ও ফলপ্রসূ করার পথে বড় ধাপ হিসেবে কাজ করবে। তরুণ ভোটারদের সক্রিয়তা শুধু নির্বাচনের ফলাফলের ওপরই নয়, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের দিকনির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে।





































