২৯ জানুয়ারি ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ:

প্রকাশিত: ২২:২২, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬

নারায়ণগঞ্জ-৫: ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস

নারায়ণগঞ্জ-৫: ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস

প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জ জেলার গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসন সদর ও বন্দর উপজেলা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৫। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে মোট ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে স্থানীয় প্রভাব, বিগত রাজনৈতিক সমীকরণ, ভোটের মাঠের বাস্তবতা ও প্রচারণার তৎপরতা বিশ্লেষণে তিনজন প্রার্থী এগিয়ে রয়েছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এ তিনে আছেন- বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন দশ দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের এবিএম সিরাজুল মামুন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন।

তাদের মধ্যে আবুল কালাম আসনটিতে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার ষষ্ঠবারের মতো তিনি আসনটিতে প্রার্থী হয়েছেন। বিগত সময়ের মতো এবারও তিনি ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে লড়ছেন। অন্যদিকে, সিরাজুল মামুন লড়ছেন তার দলীয় ‘দেওয়াল ঘড়ি’ প্রতীকে। আর স্বতন্ত্র মাকসুদ প্রচারণা চালাচ্ছেন ‘ফুটবল’ প্রতীক নিয়ে।

এছাড়া, আসনটিতে গণসংহতি আন্দোলনের তারিকুল ইসলাম সুজন (মাথাল), ইসলামী আন্দোলনের মুফতি মাছুম বিল্লাহ (হাতপাখা), ইসলামী ফ্রন্টের সৈয়দ বাহাদুর শাহ মুজাদ্দেদী (চেয়ার), বাসদের আবু নাঈম খান বিপ্লব (মই), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের এইচ এম আমজাদ হোসেন মোল্লা (ছড়ি), সিপিবির মন্টু চন্দ্র ঘোষ (কাস্তে) ও গণঅধিকার পরিষদের নাহিদ হোসেনও (ট্রাক) নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে ভোটের মাঠের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে প্রেস নারায়ণগঞ্জ কথা বলেছে স্থানীয় রাজনীতিবিদ, পর্যবেক্ষক ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে। তারা বলছেন, আসনটিতে মুখোমুখি অবস্থানে আছেন ধানের শীষ, দেওয়াল ঘড়ি ও ফুটবল প্রতীকের প্রার্থীরা। তাদের গণসংযোগ ও প্রচারণায় কর্মী-সমর্থকের উপস্থিতি ও ভোটারদের সাড়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ভোটের দিন তাদের মধ্যেই হবে মূল লড়াইটা। ভোটের সময় আরও এগিয়ে আসলে তা আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ভোটের মাঠে ত্রিমুখী সমীকরণ

এগিয়ে থাকা তিন প্রার্থীর মধ্যে আবুল কালাম বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মরহুম জালাল হাজীর সন্তান। আবুল কালাম নিজেও মহানগর বিএনপির সভাপতি ছিলেন। তিনি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে এমপি নির্বাচিত হন। দীর্ঘ বিরতির পর এবারের নির্বাচনে আবারও ধানের শীষ প্রতীকে মাঠে নেমেছেন তিনি।

পেশায় আইনজীবী আবুল কালাম রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং দলের সাংগঠনিক শক্তির কারণে এ আসনের অন্যতম শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত। প্রতিটি ওয়ার্ডে তার বিপুল সংখ্যক কর্মী ও সমর্থক সক্রিয় রয়েছেন। পাশাপাশি ‘ক্লিন ইমেজ’-এর রাজনীতিক হিসেবে তার পরিচিতিও ভোটের মাঠে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এছাড়া, তার ছেলে আবুল কাউসার আশাও সদর-বন্দরে পরিচিত মুখ। তিনি মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। এর আগে স্বেচ্ছাসেক দলের সভাপতি ছিলেন। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক এ কাউন্সিলরের নিজস্ব ভোট-ব্যাংক রয়েছে। তাও বাবা আবুল কালামকে ভোটের মাঠে সুবিধা দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

তবে, আশার কয়েকজন সমর্থকদের নেতিবাচক কর্মকা- নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তবে, সেসব ছাপিয়ে আবুল কালামের ‘ক্লিন-ইমেজ’ তাকে আসনটিতে ভিন্ন অবস্থান এনে দিয়েছে।

অন্যদিকে, ইসলামী আদর্শভিত্তিক নেতা এবিএম সিরাজুল মামুন স্থানীয়ভাবে ‘মোল্লা মামুন স্যার’ নামে পরিচিত। পেশায় ইংরেজি শিক্ষক এই নেতা দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও শৃঙ্খলাবোধ গড়ে তোলায় কাজ করে আসছেন। রাজনীতিতে তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব।

নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে তিনি জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন দশ দলীয় জোটের সমর্থন পাচ্ছেন, যা তাকে ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থানে রেখেছে। নৈতিকতা, সততা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হিসেবে পরিচিত। ২০২২ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকে অংশ নিয়ে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। যদিও সে সময় তিনি ১০ হাজারের কিছু বেশি ভোট পান। কিন্তু বর্তমানে তার অনুসারীরা এলাকায় ধারাবাহিক সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রচারণায় তার ব্যাপক সাড়া মিলছে বলে জানাচ্ছেন কর্মী-সমর্থকরা। দলীয়ভাবে খুব একটা পরিচিতি না থাকলেও সিরাজুল মামুনের ব্যক্তি-ইমেজই তাকে এ আসনে এগিয়ে রাখছে।

এদিকে, আসনটিতে একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন। তিনি ছিলেন বন্দর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। তার আগে মুছাপুর ইউনিয়ন পরিষদেও একাধিকবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। আসনটিতে একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেনও নির্বাচনী মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন।

মাকসুদ জেলা জাতীয় পার্টির সহসভাপতি ছিলেন। ২০২৪ সালে তিনি ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে বন্দর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে দলীয় পদ হারান। যদিও ওই নির্বাচনে শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের প্রকাশ্য বিরোধীতার পরও তাদের সমর্থিত প্রার্থীকে হারিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান হন। তার এই বিজয় কেবল উপজেলাতেই নয়, পুরো জেলাতে আলোচনার সৃষ্টি করে।

ওই নির্বাচনে তিনি আনারস প্রতীকে ২৯ হাজার ৮৭৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী পান ১৫ হাজার ৬৫৩ ভোট এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী পান ১২ হাজার ৬০৮ ভোট। এ ফলাফল তাকে জেলার অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।

স্থানীয়রা বলছেন, উন্নয়নমূলক কর্মকা- ও মানবিক উদ্যোগে সরাসরি সম্পৃক্ততার কারণে মাকসুদ হোসেনের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। তিনি বন্দরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংস্কার, অসহায় পরিবারকে ঘর নির্মাণ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সহায়তা, অসুস্থদের চিকিৎসা সহায়তা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। শুরু থেকেই তিনি সদর ও বন্দর এলাকায় নিয়মিত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ আবুল কালাম, ইসলামী আদর্শভিত্তিক নেতা এবিএম সিরাজুল মামুন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন- এই তিন প্রার্থীর মধ্যেই মূলত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের ভোটের লড়াই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। অন্য প্রার্থীদের প্রচারণা ও জনসংযোগ নির্বাচনী পরিবেশে প্রভাব ফেললেও মূল সমীকরণ গড়ে উঠেছে এই তিনজনকে ঘিরেই।

ফলে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের ফলাফল সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব বিবেচনায় তাদের ভোটের মাঠের এ দৌঁড়ে এগিয়ে রাখছেন। তবে, ভোটের মাঠে শেষ হাসি কে হাসবেন তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়