০৯ জানুয়ারি ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২২:১৭, ৮ জানুয়ারি ২০২৬

প্রতিবাদী আইভীর মুক্তি মেলেনি ৮ মাসেও

প্রতিবাদী আইভীর মুক্তি মেলেনি ৮ মাসেও

রাজনীতিতে তাঁর আসার কথা ছিল না। পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলেন। শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে হাজার মাইল পেরিয়ে গিয়েছিলেন সুদূর রাশিয়া। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর স্বামী-সন্তানদের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের আয়েশি জীবন ভুলে ফিরেছিলেন নিজের শেকড়ে। চিকিৎসা শাস্ত্রের ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও রাজপথে সাধারণের কাঁতারে নেমে এসেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন সত্যিকারের ‘জনপ্রতিনিধি’।

বলছিলাম, অন্যায় ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার কণ্ঠস্বর ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর কথা। দেশের প্রথম নির্বাচিত এই নারী মেয়র গত ৯ মাস ধরে আছেন কারাগারে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, গত বছরের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন তিনি ছাত্র-জনতার উপর সশস্ত্র হামলায় অংশ নিয়েছিলেন।

এমন অভিযোগের পাঁচটি মামলায় উচ্চ আদালত তাকে জামিন দিলেও নতুন আরও পাঁচটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে কাশিমপুরের কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছে। ওই কারাগারে সাবেক প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত এই নারী মেয়র সাধারণ কারাবন্দিদের চেয়ে বিশেষ কিছু সুবিধা ভোগ করলেও গত নয়টি মাস তার কাঁটছে চার দেয়ালের ভেতর বন্দি জীবন।

যদিও নতুন মামলাগুলোর একটিতেও আইভী সরাসরি অভিযুক্ত নন, পুলিশ তাকে ওই মামলায় এজাহার-বহির্ভূত অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। এসব মামলায় কারাবন্দি আইভীর গত ৫ জুন জন্মদিনটিও কাটাতে হয়েছে জেলের ভেতর। গত ঈদুল আযহাতেও তাই।

সেলিনা হায়াৎ আইভীর পিতা আলী আহাম্মদ চুনকাও ছিলেন একজন রাজনীতিক। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান আইভী চিকিৎসা শাস্ত্রে পড়াশোনা করলেও বাবার পথে হাঁটেন। দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচন না হওয়ার পর ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনের কয়েকদিন আগে রাশিয়া থেকে ফিরে চেয়ারম্যান প্রার্থী হন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রভাবশালী এক নেতাকে হারিয়ে নিরঙ্কুশ বিজয় পান তরুণ বয়সী আইভী। এরপর গত বছর তাকে অন্তর্বর্তী সরকার নিজ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত এই নগরের প্রধানের চেয়ারে ছিলেন।

টানা দুই দশকের বেশি সময় তাকে সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে যেমন লড়তে হয়েছে তেমনি তাঁর দল আওয়ামী লীগের নেতাদেরও সামলাতে হয়েছে। গডফাদারখ্যাত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেও এই শহরে টিকে ছিলেন তিনি। মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজ দলের সরকার ও সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধেও সাহসী উচ্চারণ ছিল তাঁর। সারাদেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা সাত খুনের সময়ও তিনি ছিলেন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। দুই হত্যাকাণ্ডে ওসমান পরিবার ও তাদের ঘনিষ্ঠদের জড়িত থাকার কথা তিনি অসংখ্য সভা-সমাবেশে দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন। গুম, খুন, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবি ও নাগরিক আন্দোলনগুলোতেও শামিল ছিলেন সবসময়।

প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সঙ্গে এ বিরোধের খেসারতও দিতে হয়েছে তাকে। নগরীর সাধারণ পথচারীদের হাঁটার সুবিধার্থে প্রধান সড়কটি হকারমুক্ত করার জনপ্রিয় উদ্যোগ নিয়ে শামীম ওসমানের প্রবল বিরোধীতার মুখে পড়তে হয় তাকে। এমনকি তাদের হামলারও শিকার হতে হয়। সেবার কোনোমতে প্রাণে বেঁচে যান আইভী।

এছাড়া, নগরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বাধা হয়ে দাঁড়ানো তো ছিলই।

কিন্তু এসব বাধা উৎরাতে সহযোগিতা পেয়েছিলেন যাদের, সেই সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন আইভী। নগরীর শহর ও বন্দর অংশে তার এসব কর্মকাণ্ডের নিদর্শনও রয়েছে। নগরবাসীকে সঙ্গে নিয়েই প্রবল বিরোধীতার মুখে শহরের ভেতরে গড়ে তোলেন ছায়াসুনিবিড় এক উদ্যান (নারায়ণগঞ্জ সিটি পার্ক), যেখানে শহর ও শহরতলীর মানুষজন খুঁজে পেয়েছেন বিনোদনেরও অন্যতম উৎস। বন্দরবাসীর দীর্ঘদিনের আকাঙ্খা শীতলক্ষ্যা নদীর উপর একটিমাত্র সেতুর জন্যও লড়েছেন। দ্বিতীয় দফায় মেয়র হওয়ার আগে যে আশ্বাস মানুষকে দিয়েছিলেন সেই কদম রসুল সেতুর কাজও এগিয়ে নিয়েছিলেন আইভীই।

২০২২ সালে তৃতীয় দফায় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনেও নিরঙ্কুশ বিজয় পান আইভী। আড়াই বছরের মাথায় গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে সারাদেশের বারোটি সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদের অপসারণ করা হয়। দায়িত্ব হারান সিটি মেয়র আইভীও।

গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অনেকেই শহর ছাড়লেও আইভী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে কোনো ভূমিকা না রাখায় ছিলেন নিজ পৈতৃক বাড়ি দেওভোগের ‘চুনকা কুটিরেই’।

গত বছরের আগস্টে মেয়র পদ থেকে অপসারণের আগ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা না হলেও সেপ্টেম্বর মাসে তাকে প্রথম পোশাক শ্রমিক মিনারুল হত্যার অভিযোগের মামলায় আসামি করা হয়। আন্দোলনের সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শিমরাইলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মিনারুল। এরপর আরও চারটি মামলায় আইভীকে আসামি করা হয়।

চলতি বছরের গত ৮ মে রাতে আইভীর বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। জনপ্রিয় এই মেয়রকে গ্রেপ্তারে বাধা দেন হাজারো এলাকাবাসী। রাতভর চুনকা কুটিরে অপেক্ষার পরদিন সকাল ছয়টার দিকে আইভী স্বেচ্ছায় গিয়ে পুলিশের গাড়িতে ওঠেন।

যদিও যাওয়ার পথে বিরোধীদলের লোকজনের হামলার মুখে পড়তে হয় আইভীকে বহন করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়িবহরকে। সাবেক মেয়র ওই হামলায় আঘাতপ্রাপ্ত না হলেও দায়িত্বরত কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। যদিও পরে এই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আইভীকেই গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।

এসব মামলায় নিম্ন আদালতে জামিন চেয়ে না পেলে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে হয় আইভীর পরিবারের সদস্যদের। গত ৯ নভেম্বর হাই কোর্টের বিচারপতি এ এস এম আবদুল মোবিন ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ তাকে পাঁচটি মামলায় জামিন দেন।

কিন্তু এরপর চারটি হত্যাসহ মোট পাঁচটি মামলায় নারায়ণগঞ্জ সিটির সাবেক এ মেয়রকে গ্রেপ্তার দেখাতে পুলিশ আবেদন করলে ১৮ নভেম্বর তা মঞ্জুর করে নারায়ণগঞ্জের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।

যদিও কয়েকটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর নতুন করে আরও পাঁচ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর এই আদেশের বিষয়ে আইভীর পক্ষে আদালতে শুনানি করা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আওলাদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “এ মামলাগুলোতে আইভী আসামি নন, কোথাও তার নাম নেই। গ্রেপ্তার কোনো আসামিও ঘটনাগুলোর সঙ্গে তার জড়িত থাকার কোনো স্বীকারোক্তিও দেয়নি।”

“আইভী হাই কোর্টে পাঁচটি মামলায় জামিন পেয়েছিলেন, কেবলমাত্র তার কারামুক্তি বিলম্বিত করতেই পুলিশ তড়িঘড়ি করে নতুন পাঁচটি মামলায় ‘শ্যোন অ্যারেস্টের’ আবেদন করে।”

এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হবার কথাও জানান এই আইনজীবী।

আইভীর সমর্থকরা বলছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে বিরোধী কোনো ভূমিকায় ছিলেন না আইভী। এমনকি পরোক্ষ কোনো ভূমিকা ছিল কিনা তারও কোনো প্রমাণ নেই। তাছাড়া, সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে তিন মেয়াদসহ পৌর চেয়ারম্যান হিসেবে টানা ২২ বছর জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এই সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ ওঠেনি। বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থান, দখলদার ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর ভূমিকার জন্য জনপ্রিয়তা পান। অনেক সময় দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়েও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
তার এমন ভূমিকার কারণে ২০১৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রভাবশালী সাময়িকী দি এশিয়ান তাঁকে এশিয়ার প্রভাবশালী নারী মেয়রদের তালিকায় সপ্তম স্থান দেয়। এছাড়া, বাংলা একাডেমীর সমাজসেবা ক্যাটাগরিতে পেয়েছেন সম্মানসূচক ফেলোশিপ।

কিন্তু তাকে আন্দোলনকালীন সময়ের সংঘটিত হত্যা ও হামলার ঘটনায় দীর্ঘদিন জেলে রাখার নজির রাজনীতিতে সততা, সাহসী ও অন্যায়ের সঙ্গে আপোসহীনতাকে নিরুৎসাহিত করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়