নারায়ণগঞ্জে জামায়াত নেতৃত্বাধীন সমমনা জোটের ভোট কত?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনে ইসলামিক ও সমমনা ১১ দলীয় জোটের সাতটি দল তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে এই জোটের সাতটি দলের পনেরো প্রার্থী এখন ভোটের লড়াইয়ে রয়েছেন। এ তালিকায় জামায়াতে ইসলামী ছাড়াও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, আমার বাংলাদেশ পার্টিসহ বিভিন্ন শরিক দলের নাম এখানে দেখা যাচ্ছে।
তবে, বিগত নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, এই জোটের অনেক প্রার্থী আগেও ভোটের মাঠে ছিলেন, কিন্তু ফলাফলের দিক থেকে তেমন সুবিধা করতে পারেননি। জয়ের ইতিহাস কারোরও নেই। ১৯৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন ইসলামী আন্দোলনের একজন প্রার্থী, যা ছিল প্রায় ২১ হাজার। অন্যদের অধিকাংশের প্রাপ্ত ভোট ছিল পাঁচ হাজারের নিচে।
ফলে, এবারের নির্বাচনে তাদের লক্ষ্য শুধু আসন জেতা নয়; বরং ভোটের পূর্বের রেকর্ড ভাঙা এবং নতুন অবস্থান তৈরি করা। যদিও জোটের প্রার্থীরা নির্বাচনী মাঠে অন্যান্য ছোট দলগুলোর তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি ভোটের সম্ভাবনা রাখলেও, বিগত ভোটের হিসাব দেখলে ধারণা করা যায়, চ্যালেঞ্জ যথেষ্ট বড়।
নির্বাচনকে সামনে এই জোটে আরও আছে- লিবারেল ডেভেলপমেন্ট পার্টি (এলডিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি।
জোটগতভাবে এখনো প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত না হওয়াতে একই আসনের বিপরীতে জোটের একাধিক দলের প্রার্থী এখনো ভোটের মাঠে আছেন।
নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে খেলাফত মজলিসের আ. কাইয়ুম শিকদার, জামায়াতে ইসলামীর আনোয়ার হোসেন মোল্লা, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মো. ইলিয়াস মোল্লা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. আবুল কালাম, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. শাহজাহান, আমার বাংলাদেশ পার্টির মো. আরিফুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের গোলাম মসীহ্, জামায়াতে ইসলামের মো. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মো. আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির আব্দুল্লাহ আল আমিন, ইসলামী আন্দোলনের মো. ইছমাঈল হোসেন কাউছার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী আনোয়ার হোসেন, খেলাফত মজলিসের ইলিয়াস আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে খেলাফত মজলিসের এবিএম সিরাজুল মামুন, ইসলামী আন্দোলনের মুফতি মাছুম বিল্লাহ।
তাদের মধ্যে, জামায়াতের ইলিয়াস মোল্লা, খেলাফত আন্দোলনের মো. আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী, খেলাফত মজলিসের এবিএম সিরাজুল মামুন, ইসলামী আন্দোলনের মুফতি মাছুম বিল্লাহ আগেও নির্বাচনী মাঠে ছিলেন। আতিকুর রহমান এবার খেলাফতের প্রার্থী হলেও এর আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হয়েছিলেন। যদিও ফলাফল কারোরই জয়ের পক্ষে ছিল না। এদিকে এবারই প্রথম জোটভুক্ত জাতীয় নাগরিক পার্টি ও এবি পার্টি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
জোটভুক্ত দল ও দলের প্রার্থীদের নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জোটের অনেক প্রার্থী বিগত নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, কিন্তু ভোটের পরিসংখ্যান তাদের খুবই সীমিত। ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত বিভিন্ন নির্বাচনে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট অর্জন করেছেন ইসলামী আন্দোলনের এক প্রার্থী, যিনি ২১ হাজারের কিছু বেশি ভোট পেয়েছিলেন। অন্যদের মধ্যে অনেকেই বিগত নির্বাচনে ৫ হাজারের নিচে ভোট পেয়েছেন, যা তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ও ভোটের মাঠে তাদের অবস্থান তুলে ধরে।
পুরোনো নির্বাচনের পরিসংখ্যান
নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘ তিন দশক পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে তিনটি আসনে এবং তার আগে ১৯৯১ সালে দু’টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল দলটি। তবে, তারা কেউই ৬ শতাংশের বেশি ভোট পাননি।
১৯৯১ সালে জামায়াত নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে ইলিয়াস মোল্লা এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে মো. নজরুল ইসলামকে প্রার্থী করেছিল। তারা ওই নির্বাচনে পেয়েছিলেন যথাক্রমে- ৬৮৩০ ও ৫৫৮২ ভোট। যা মোট ভোটের ৬ দশমিক ১ শতাংশ এবং ৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
এরপর ১৯৯৬ সালে তিনটি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল দলটি। যাদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের ইলিয়াস মোল্লাও ছিলেন। তিনি এ নির্বাচনে পেয়েছিলেন ৩২৫১ ভোট, যা মোট ভোটের ২ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থ্যাৎ, আগেরবারের চেয়েও ৩ হাজার ভোট কম পেয়েছিলেন।
ওই নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী মো. নুরুল ইসলাম ৩৮৬২ ভোট পেয়েছিলেন। যা মোট ভোটের ২ শতাংশ ছিল। এছাড়া, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে মো. এ কাদের পেয়েছিলেন মোট ভোটের মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। তিনি পেয়েছিলেন মাত্র ৩২৯৯ ভোট।
জামায়াতে ইসলামী ছাড়াও পূর্বে ভোটের মাঠে থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসেরও। তবে, তাদেরও ফলাফল উল্লেখ করার মতো ছিল না।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারটি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। চরমোনাই পীরের নেতৃত্বের এ ইসলামী ঘরানার দলটি হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।
ওই নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে হাতপাখার প্রার্থী সৈয়দ আহমেদ ৩৫৯৪ ভোট, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে মাওলানা মো. হাবিবুল্লাহ ১৬৭১ ভোট, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী ১০,৩৭৫ ভোট এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে শফিকুল ইসলাম ১১,৩৯৮ ভোট পেয়েছিলেন।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে দলটি কোনো প্রার্থী সেবার দেয়নি।
২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি অন্যান্য দলগুলোর সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনও বয়কট করে। পরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা আবার অংশগ্রহণ করেন। এবং পাঁচটি আসনে হাতপাখার প্রার্থী দেয় দলটি।
কিন্তু নানা অনিয়ম ও কারচুপির কারণে ওই নির্বাচনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পায়।
২০১৮ সালের ওই নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. ইমদাদুল্লাহ ৬১৯১ ভোট, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে মো. নাসির উদ্দিন ৩১৩৭ ভোট, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে মাওলানা মো. সানাউল্লাহ নূরী ১০,০০৯ ভোট, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে শফিকুল ইসলাম ২১,৭০৬ ভোট এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে হাজী মো. আবুল কালাম পান ৬৪২০ ভোট।
বিতর্কিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খেলাফত মজলিসের দেয়ালঘড়ি প্রতীকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে লড়েছিলেন হাফেজ মো. কবির। আসনটিতে তিনি ভোট পেয়েছিলেন মাত্র ৩২৫টি।
সংসদ নির্বাচন ছাড়াও ২০২২ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। মেয়র পদে এ তিনটি দল যথাক্রমে মুফতি মাছুম বিল্লাহ, এবিএম সিরাজুল ইসলাম মামুন ও মো. জসীম উদ্দিনকে প্রার্থী করে। সাত প্রার্থীর মধ্যে ভোটের হিসাবে মাছুম তৃতীয়, সিরাজুল পঞ্চম এবং জসীম ছিলেন ষষ্ঠ নম্বরে।
সিটি নির্বাচনে মাছুম বিল্লাহ ২৩,৯৮৭ ভোট, সিরাজুল মামুন ১০,৭২৪ ভোট এবং মো. জসীম উদ্দিন ১৩০৯ ভোট পেয়েছিলেন।
তবে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন কিংবা নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মতো বড় কলেবরের নির্বাচনে ইসলামী ও সমমনা জোটের দলগুলোর খুব বাজে ফলাফলের অভিজ্ঞতা থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের কেউ কেউ বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু তা জাতীয় নির্বাচনে কেমন প্রভাব ফেলতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও জোটের নেতারা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদের ভালো ফলাফলের আশা।
বিগত নির্বাচনে আশানুরূপ ফলাফল না পেলেও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটভুক্ত দলগুলো থেকে প্রার্থী হয়েছেন কেউ কেউ। এবার তারা তুলনামূলক ভালো ফলাফলের আশা করলেও বিগত পরিসংখ্যান এবং মাঠপর্যায়ে এখন পর্যন্ত তাদের অবস্থান জয়ের অনুকূলে নেই বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
১১ দলীয় জোটের একাধিক নেতা ও কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যদিও নারায়ণগঞ্জ-৪ এবং ৫ আসনে একধরনের সম্ভবনা তৈরি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এনসিপির তরুণ প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিন ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে অভিজ্ঞ রাজনীতিক এবিএম সিরাজুল ইসলাম মামুনকে জোটের চূড়ান্ত প্রার্থী করার আলোচনা চলছে। আসন দু’টিতে জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রার্থীদের সরিয়ে নিলেও অন্যান্য শরিক দল এখনো তা করেনি।





































