০৭ জানুয়ারি ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৯:৩৫, ৫ জানুয়ারি ২০২৬

নির্বাচন: কোনো আসনেই নেই নারী প্রার্থী

নির্বাচন: কোনো আসনেই নেই নারী প্রার্থী

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নারীদের উপস্থিতি সবসময়ই চোখে পড়ার মতো। ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান- প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই জেলার নারীরা সরব ছিলেন। শুধু রাজনীতিতেই নয়, সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও তারা বিশেষ অবদান রেখে দেশ-বিদেশে সমাদৃত হয়েছেন। এমনকি গত বছরের জুলাইতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনও সংগঠিত হয়েছিল নারীদের হাত ধরেই। ছাত্রদের এ আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেওয়া পর্যন্ত নারী শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী ও রাজনৈতিক কর্মীরা মিছিল ও সমাবেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই শক্তি অনুপস্থিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।

দীর্ঘ সময়ের একদলীয় শাসন-ব্যবস্থার অবসানের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাজপথের লড়াকু নারীদের অংশগ্রহণ যেখানে আরও জোরদার হওয়ার কথা ছিল সেখানে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার পাঁচটি আসনের একটিতেও নেই নারী প্রার্থী। প্রার্থী তালিকায় পুরুষ রাজনীতিকদের একক উপস্থিতি জুলাই-পরবর্তী আকাক্সক্ষাকে অনেকটা ম্লান করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।

গত ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর পাঁচটি আসনের বিপরীতে ৯৩ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। কিন্তু জমা পড়ে ৫৬টি মনোনয়নপত্র। গত শনিবার যাচাই-বাছাই শেষে বাদ পড়েন ১৬ জন। বৈধ প্রার্থী বলে ঘোষিত হন ৩৬ জন প্রার্থী। কিন্তু এ তালিকায় কোনো নারীর নাম নেই।

যদিও পাঁচটি আসনের দুইটিতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন দুই নারী। তাদের একজন মনোনয়নপত্র আর জমা দেননি। অপরজন, যাচাই-বাছাইতে বাদ পড়েছেন।

রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন মোসা. নারগিস আক্তার। তিনি আসনটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়া বন্দর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেনের স্ত্রী। কিন্তু পরে এ নারী আর তার মনোনয়নপত্রটি রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেননি।

মনোনয়নপত্র জমা দিয়েও যাচাই-বাছাইতে বাদ পড়েছেন ফাতেমা মনির। সদর উপজেলার সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ফাতেমা নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে গড়মিল পাওয়ায় তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। ফলে সম্ভাব্য একমাত্র নারী প্রার্থীর সুযোগও শেষ হয়ে যায়।

যদিও, স্বাক্ষরের গড়মিল সংশোধন এবং নির্বাচন কমিশনে আপিল করে নির্বাচনী মাঠে ফেরার সম্ভবনা ফাতেমা মনিরের শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু এখন পর্যন্ত বৈধ তালিকায় তিনি থাকছেন না। 

নারগিস ও ফাতেমা ছাড়া আর কোনো নারী নির্বাচনী মাঠে নামার আগ্রহ দেখাননি। এমনকি, কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল থেকেও কোনো নারীকে আসনগুলোতে মনোনীত করা হয়নি। নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক পারভীন আক্তার। কিন্তু বিএনপি তাকে বিবেচনায় না রেখে মনোনীত করেছেন দলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদকে। যদিও ধানের শীষের প্রার্থী হয়ে আজাদ এর আগেও নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন।

এ পরিস্থিতিতে অনেকে বলছেন, চব্বিশের আন্দোলনের পর রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতে যে ধরনের পরিবেশ তৈরি করার কথা ছিল তা করতে ব্যর্থ হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ নেতাদের কর্তৃত্বকে প্রাধান্য দিয়ে নারীদের পথ সংকীর্ণ করা হয়েছে।

যার উদাহরণ হিসেবে তারা বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর জেলা ইউনিটের প্রধান কিংবা সেকেন্ড ইন কমাণ্ডের দায়িত্বেও নারীদের উপস্থিতি আগস্টের পরও বদলায়নি। এটি, কেবল স্থানীয় নয়, জাতীয় রাজনীতিরও প্রতিবিম্ভ বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানীর পাশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ একটি জেলায় নারী-শূণ্য প্রার্থী তালিকা হতাশ করেছে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ফারহানা মানিক মুনাকেও। এর জন্য পেশিশক্তি-নির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হওয়াকে দায়ি করেছেন তিনি।

ফারহানা বলেন, “নারায়ণগঞ্জে এবার নির্বাচনে কোনো নারী প্রার্থী না থাকা স্পষ্ট করে দেখায় যে, আন্দোলনের রাজপথ থেকে নির্বাচনের ব্যালট পর্যন্ত নারীদের যাত্রাপথ এখনো গভীরভাবে সংকুচিত। সমস্যা শুধু নির্বাচনী অংশগ্রহণে নয়; পেশিশক্তি-নির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নারীর মর্যাদা ধারাবাহিকভাবে অবমূল্যায়িত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত নারীকে অবদমনের নানা কৌশল দৃশ্যমান হলেও রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নির্বিকার।”

“যে ব্যবস্থার বদলের প্রত্যাশায় অভ্যুত্থান হয়েছিল, সেই কাঠামোতেই আজ নারীরা সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। মিছিলে নারীর উপস্থিতি গ্রহণযোগ্যতা হলেও ক্ষমতার সিদ্ধান্তমূলক কাঠামোয় নারীর ন্যায্য হিস্যার প্রশ্নে দলগুলোর আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে। এমনকি নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে এই অনীহা আমরা ঐক্যমত কমিশনের বৈঠকেও প্রত্যক্ষ করেছি।”

সর্বশেষ

জনপ্রিয়