নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে কালামের বিরুদ্ধে নেই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী
সিটি কর্পোরেশনের ১৭টি ওয়ার্ড এবং বন্দর উপজেলা এলাকা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন। আসনটি শিল্প-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ জেলার মূল শহরে হওয়ায় সবদিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। তাই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে প্রার্থী দেয়ার ক্ষেত্রে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেয় রাজনৈতিক দলগুলো। ফলে প্রায় সবাই চেষ্টা করেন প্রভাবশালী, হেভিওয়েট ও যোগ্য ব্যক্তিকে প্রার্থীতা দিতে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এবার আসনটির অধিকাংশ প্রার্থীই জনপ্রিয় ও আলোচিত। এর মধ্যে একজন আসনটির তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে মোট ১২ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। যার মধ্যে চার জনের মনোনয়ন বাতিলের পর ৮ জনের মনোনয়ন বৈধ হয়। তারা হলেন: বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, খেলাফত মজলিসের এবিএম সিরাজুল মামুন, সিপিবির মন্টু চন্দ্র ঘোষ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের সৈয়দ বাহাদুর শাহ্ মুজাদ্দেদী, গণসংহতি আন্দোলনের তারিকুল ইসলাম সুজন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুফতি মাসুম বিল্লাহ, বাসদের আবু নাঈম খান বিপ্লব, ও বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের এইচএম আমজাদ হোসেন মোল্লা।
এই আট প্রার্থীর মধ্যে আবুল কালাম নারায়ণগঞ্জের সুপরিচিত বিএনপিপন্থি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তার পিতা হাজী জালাল উদ্দিন ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনেই (বিলুপ্ত ঢাকা-৩২) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে আবুল কালাম পিতার দেখানো পথে হাটেন এবং বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। মহানগর বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে এ আসনে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চতুর্থবারের মতো এ আসনে তাকে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ সময় মহানগরের নেতৃত্ব দেয়া বিএনপির প্রবীণ এ নেতা সাংগঠনিকভাবে খুবই শক্তিশালী। এ আসনের তিন বারের সাবেক সংসদ সদস্য হওয়ায় বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটারের মাঝে তার গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। বিশেষ করে বন্দর উপজেলার মধ্যে। বন্দরকে তার দুর্গ বলেও আখ্যায়িত করেন অনেকে।
এ আসনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন এগারদলীয় জোটের প্রার্থী এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। তবে জোটের প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এবিএম সিরাজুল মামুন। পেশায় শিক্ষক সিরাজুল মামুন আশির দশকে নারায়ণগঞ্জে একজন জনপ্রিয় ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হন। সে সময় তিনি “মোল্লা মামুন স্যার” নামেও পরিচিত ছিলেন।
ছাত্রজীবনেই তিনি ইসলামী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। নব্বইয়ের দশকে ভারতের বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদ, লংমার্চ, পার্বত্য শান্তিচুক্তি প্রতিবাদ, ২০১৩ সালে নারায়ণগঞ্জে হেফাজতের আন্দোলনকে সংগঠিত করা ও শাপলা চত্বরের সমাবেশে অংশগ্রহণ করে মামলার শিকার হন। খেলাফত মজলিস সুসংগঠিত ও প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জে তিনি দলটি নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তার সাংগঠনিক দক্ষতা ও পেশাগত পরিচয় এ আসনে তাকে একজন যোগ্য প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরেছে।
আরেক প্রবীণ প্রার্থী বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মন্টু চন্দ্র ঘোষ। পড়াশোনার তাগিদে মুন্সিগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জ আসে, ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে সিপিবি জেলা সভাপতি এবং এখন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ জীবন সমাজের নিন্মশ্রেণী ও শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সরব এই নেতা নারায়ণগঞ্জে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অর্জন করেছেন।
প্রবীণ রাজনৈতিকদের ভীড়ে আলোচনায় রয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী তারিকুল ইসলাম সুজন। বয়সে তরুণ হলেও সাংগঠনিকভাবে বেশ শক্তিশালী এই প্রার্থী। ছাত্র ফেডারেশনের রাজনীতি থেকে শুরু করে মূল দল এবং বিগত বছরগুলোতে দলটির জেলা সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করে আসছেন। মাঠপর্যায়ের কাজ, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সমসাময়িক রাজনীতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার কারণে তিনি ইতোমধ্যে ভোটারদের নজর কাড়েছেন।
জলাবদ্ধতা, যানজট, বেকারত্ব, ডেঙ্গু, মাদক ও সন্ত্রাসের মতো ইস্যুতে সরব ভূমিকা রেখে আসছেন তিনি। প্রথম থেকেই আলোচিত ত্বকী হত্যার বিষয়ে প্রতিবাদী ভূমিকা রেখেছেন। একই সঙ্গে তিনি সন্ত্রাসী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত এই নারায়ণগঞ্জকে পরিবর্তনের কথা বলেন। নির্বাচনী সময়ের বাইরেও নিয়মিত সাধারণ মানুষের সাথে সম্পৃক্ত থাকা ও বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করার মতো উদ্যোগের কারণে তরুণদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।
এগারদলীয় জোটের শরিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুফতি মাসুম বিল্লাহও এ আসনে আলোচনায় রয়েছেন। তিনি একজন সজ্জন রাজনীতিবিদ ও ইসলামীক বক্তা। দীর্ঘ সময় নারায়ণগঞ্জে রাজনীতি করে আসছেন। তার সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তৃণমূলে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। এছাড়া গত কয়েক দফায় দলটির মহানগরের দায়িত্ব থাকার কারণে এ আসনের ভোটারদের মধ্যেও তার সুপরিচিতি রয়েছে। তিনি এর আগে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
বৈধ প্রার্থীদের পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছেন মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া জাতীয় পার্টির বহিষ্কৃত নেতা মাকসুদ হোসেন। বন্দর উপজেলার একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান এবং এখন সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করবেন এই নেতা। উপজেলা নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মাকসুদ নির্বাচনে বিজয়ী হন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিলেও বকেয়া গৃহকরের কারণে তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়। তবে তিনি আপিল করবেন এবং প্রার্থীতা ফিরিয়ে এনে নির্বাচন করবেন বলে নিশ্চিত করেছেন তার ঘনিষ্ঠ সূত্র।
সদর ও বন্দর উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনের এক ভাগে দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি থাকায় তার রয়েছে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা। মাঠপর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের কারণে মাকসুদের রয়েছে নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মী বাহিনী। এছাড়া উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং মাঠে সক্রিয় উপস্থিতি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বন্দরে একটি শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করেছে। সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্যে শহরেও তিনি প্রচারণা চালাচ্ছেন। অনেকেই মনে করছেন, সঠিক কৌশলে প্রচারণা চালালে এবং তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের সুসংগঠিত করলে তিনি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বড় দলগুলোর প্রার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারেন।





































