০৫ জানুয়ারি ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৬:০৪, ৩ জানুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ১৭:২২, ৩ জানুয়ারি ২০২৬

নারায়ণগঞ্জে কথা বলে গেলেন আন্তর্জাতিক আলোকচিত্রী পাম পারকিন্স

নারায়ণগঞ্জে কথা বলে গেলেন আন্তর্জাতিক আলোকচিত্রী পাম পারকিন্স

আফসানা আক্তার, প্রেস নারায়ণগঞ্জ: যুক্তরাষ্ট্রের নর্দান ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা আন্তর্জাতিক আলোকচিত্রী পাম পারকিন্স বাষট্টি বছর বয়সে অবসর গ্রহণের পর ফটোগ্রাফি শুরু করেন। বিশ্বের ৯৮তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ভ্রমণে এসে ৮২ বছর বয়সী এই আলোকচিত্রী বলেন, ফটোগ্রাফির জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সামান্য আগ্রহ ও প্রেরণা।

তিনি বলেন, “ফটোগ্রাফির জন্য আপনার শুধু একটু মোটিভেশন দরকার। তোমার কাজ খুব ভালো, ছবিটা সুন্দর হয়েছে, এমন কিছু অনুপ্রেরণা। আমি যখন বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে ফটোগ্রাফি করতাম, তখন ক্যামেরা বা সেটিং সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতাম না। ধীরে ধীরে প্রশিক্ষণ নেওয়া, ফটোগ্রাফি ক্লাবে যুক্ত হওয়া, এবং ফটোগ্রাফি ওয়াকে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে শিখেছি।”


শুক্রবার (২ জানুয়ারি) বিকেলে নারায়ণগঞ্জ ফটোগ্রাফি ক্লাবের আয়োজিত এক আড্ডায় নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এসব কথা বলেন পাম পারকিন্স। সংগঠনের সহপ্রতিষ্ঠাতা জয় কে রায় চৌধুরী, আজীবন সদস্য এনামুল কবীর যৌথভাবে আয়োজনটির সমন্বয় করেন। 

আড্ডার শুরুতে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মুনতাসির মঈন  পাম পারকিন্সের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পাম পারকিন্স নর্দান ক্যালিফোর্নিয়ার একজন পর্যটক এবং পথচিত্র (স্ট্রিট ফটোগ্রাফি) ও প্রতিকৃতি (পোট্রের্ট) আলোকচিত্রী। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বিশ্বের ৯৮টি দেশ ভ্রমণ করে আলোকচিত্র ধারণ করে চলেছেন। তাঁর কাজের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ ও সংস্কৃতি—বিশেষ করে দূরবর্তী ও ঐতিহ্যবাহী সেই সব সম্প্রদায়, যাদের জীবনধারা দিন দিন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ভারত ও আফ্রিকার সঙ্গে দীর্ঘ ও গভীর সম্পর্কের সুবাদে তিনি সেখানকার ঝুঁকিপূর্ণ আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোকে আলোকচিত্র ও নথিভুক্ত করেছেন। ধৈর্য, কৌতূহল ও সম্মানের মধ্য দিয়ে তিনি এসব মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।

পাম পারকিন্সের পুরস্কারপ্রাপ্ত আলোকচিত্র সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকার বিভিন্ন গ্যালারিতে ব্যাপকভাবে প্রদর্শিত হয়েছে। তাঁর আলোকচিত্রের মাধ্যমে তিনি তাঁর জায়গায় দাঁড়াতে, তাঁর দেখা মানুষগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে এবং তিনি যেভাবে বিশ্বকে অনুভব করেছেন, সেভাবেই দেখতে দর্শকদের আমন্ত্রণ জানান। যেখানে সৌন্দর্য ও সহমর্মিতার সঙ্গে স্থিতিস্থাপকতা, ঐতিহ্য এবং অভিন্ন মানবতার গল্প ফুটে ওঠে। 

নিজের আলোকচর্চা শুরুর অভিজ্ঞতা জানিয়ে পাম পারকিন্স বলেন, “অবসর গ্রহণের পর আমি ও আমার স্বামী সিদ্ধান্ত নিই আমরা ভ্রমণ করব। প্রথম ভ্রমণে আমার সঙ্গে ছিল ছয় মেগাপিক্সেলের একটি পয়েন্ট অ্যান্ড শুট ক্যামেরা। সেই ভ্রমণই আমার জীবন বদলে দেয়। ভ্রমণের সময় আমার মনে হয়, মানুষের জীবন আমি নথিভুক্ত করতে চাই। ২০১৪ সালে এক ভদ্রমহিলাকে আমার তোলা ছবি দেখাচ্ছিলাম। তখন তিনি বললেন, ‘পাম, তোমার চোখ খুব ভালো।’ পরে আফ্রিকায় গিয়ে বুঝলাম, আরও ভালো ক্যামেরার প্রয়োজন। এরপর আমি বারো মেগাপিক্সেলের একটি ক্যামেরা কিনে নিয়মিত ছবি তুলতে শুরু করি।”

বর্তমানে ফটোগ্রাফির জন্য তাঁর পছন্দের দেশ ভারত। তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ, এবং দুই দেশের মানুষ ও সংস্কৃতি অনেকটাই কাছাকাছি। সে কারণে তিনি তাঁর বাংলাদেশি বন্ধুদের নিজের তোলা আলোকচিত্রের মধ্য দিয়ে আমেরিকার নিউয়র্ক শহরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এ সময় তিনি শহরটির বিভিন্ন স্থান ও ভিন্ন ভিন্ন সময়ের ছবি প্রদর্শন করেন এবং ছবিগুলোর পেছনের গল্প তুলে ধরেন।

পাম পারকিন্স বলেন, “ছবি তোলার জন্য আমি সাবওয়ে এলাকা পছন্দ করি। সেখানে সব ধরনের মানুষের আনাগোনা থাকে। আমি সব সময় মানুষের সঙ্গে কথা বলি। আমার কাছে ক্যামেরা হচ্ছে মানুষের সঙ্গে কথা বলার একটি মাধ্যম। একজন আলোকচিত্রী ও লেখক হিসেবে আমি আমার ছবির মাধ্যমে গল্প বলতে ভালোবাসি। একই সঙ্গে প্রতিকৃতি ছবি তুলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কারণ আমার মনে হয়, প্রতিকৃতি আমাকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে যায়।”

এর আগে তিনি ঢাকায় সাত দিনের একটি কর্মশালা পরিচালনা করেন। সেখানে তিনি চার হাজার পাঁচশ ছবি ধারণ করেছেন বলে জানান। তিনি বলেন, “আমি কখনো ছবি মুছে ফেলি না। কারণ ছবি তুলতে তুলতে আমাদের চোখ অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে যায়। তখন কিছু ছবি অকেজ মনে হলেও সময়ের ব্যবধানে সেই ছবিগুলোর ভালো দিক চোখে পড়ে।”

এ সময় তিনি বাংলাদেশে করা কর্মশালার ছবিগুলো প্রদর্শন করেন এবং বাংলাদেশ, এ দেশের মানুষ, সংস্কৃতি ও আলোকচিত্র নিয়ে কথা বলেন।

বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ, নানা সংস্কৃতি ও মানুষের ভিন্নতা নিয়ে করা অংশগ্রহণকারীদের করা এক প্রশ্নের উত্তরে পাম পারকিন্স বলেন, “ভ্রমণ মানুষকে আরও পরিণত করে তোলে, দৃঢ়তা ও ধৈর্য শেখায়। যেই দেশেরই হই না কেন, আমরা সবাই মানুষ। আমাদের সবার অনুভূতি আছে। আমরা আনন্দে হাসি, কষ্টে কাঁদি। ঢাকার কয়েকটি এলাকায় আমি ঘুরেছি, অনেক কষ্ট দেখেছি। কিন্তু দিনশেষে আমরা সবাই একই রকম। ঢাকা একটি সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত শহর। বাংলাদেশ ভ্রমণের সবচেয়ে বড় পাওয়া ছিল আপনাদের সঙ্গে এই আলোচনা ও কথোপকথন। এমন সুন্দর অভিজ্ঞতার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।”

নারায়ণগঞ্জ ফটোগ্রাফি ক্লাবের সভাপতি ইউসুফ শাহরিয়ার মুনতাকিম ও সাধারণ সম্পাদক মুনতাসির মঈনের সঞ্চালনায় এনপিসির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈকত সাহা পামির, যুগ্ম সম্পাদক শুভ্র বাপ্পী, কোষাধ্যক্ষ মনিরুজ্জামান আপন, প্রচার সম্পাদক আজিজুল হাকিম, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসিফ অহমেদ, দপ্তর সম্পাদক মোস্তাকিম আহমেদ মুকুট, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ সুমন, কার্যকরী সদস্য অনিক দাস, সহযোগী সদস্য সানন্দা সাহা, জুমেন খান, তামান্না মেহেরুনসহ অন্যান্য সদস্যরা আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়