নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন
মান্নান-গিয়াসে লড়াই, ফ্যাক্টর তিন
ঐতিহাসিক সোনারগাঁ উপজেলা ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন। শিল্প-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এ আসনটি বিভিন্ন কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। এখন পর্যন্ত আসনটিতে বৈধ প্রার্থী ১০জন। যার মধ্যে রয়েছে একাধিক প্রভাবশালী ও হেবিওয়েট প্রার্থী। যারা এর আগেও আসনটিতে জনপ্রতিনিধি নিবাচিত হয়েছেন। যার ফলে আসন্ন ক্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বীতা দেখা যাবে বলে মনে করেছেন ভোটাররা।
নারায়ণগঞ্জ জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে, জেলার পাঁচটি আসনে মোট ৯৩জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। যার মধ্যে ৫৬জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা করেন। পরে যাচাই-বাছাই শেষে ৪০ জনের প্রাথীতা বৈধ ঘোষণা করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা রায়হান কবির।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে মোট ১১জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। যার মধ্যে সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিমের মনোনয়ন বাতিলের পর ১০জনের মনোনয়ন বৈধ হয়। তারা হলেন: বিএনপির প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান, স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, জামায়াতে ইসলামীর ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া, গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী অঞ্জন দাস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী, ইসলামী আন্দোলনের গোলাম মসীহ্, জনতার দলের আবদুল করিম মুন্সী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. শাহজাহান, আমার বাংলাদেশ পার্টির আরিফুল ইসলাম ও গণঅধিকার পরিষদের মো. ওয়াহিদুর রহমান মিল্কী।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান। তিনি দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সভাপতি। ২০১৮ সালে উপজেলা নির্বাচনে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে সে বছরেরই শেষের দিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য তিনি পদত্যাগ করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির এই প্রার্থীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হতে যাচ্ছেন তারই দলের বহিষ্কৃত নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি গিয়াস উদ্দিন আসনটিতে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। বঞ্চিত হয়ে পরে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাওয়ায় সম্প্রতি তাকে দলের সকল পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
বহিষ্কৃত হওয়ার পরও নির্বাচনী মাঠে দৃঢ়ভাবে আছেন গিয়াস উদ্দিন। নিয়মিত নিবাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছেন তিনি। এছাড়া সম্প্রতি আসনটিতে সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলটি যুক্ত করে সীমানা বৃদ্ধি করা হয়। আর সিদ্ধিরগঞ্জকে গিয়াস উদ্দিনের সবচেয়ে শক্তিশালী জোন বলা হয়ে থাকে। এ অঞ্চলে তার ব্যাপক কর্মী-সমর্থক রয়েছে। এছাড়া ২০০১ সালে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ফলে সাধারণ ভোটারদের মাঝেও তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
বিএনপি ছাড়াও এ আসনে আলোচনায় রয়েছেন গণসংহতি আন্দোলন ও গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীরা।
গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. ওয়াহিদুর রহমান মিল্কী। তিনি দলটির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি। দীর্ঘদিন যাবত সোনারগাঁয়ের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছেন। পেশায় ব্যবসায়ী ওয়াহিদুর রহমান প্রথম থেকেই নির্বাচনী মাঠে সরব ছিলেন। আসনটির তরুণ ভোটারদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে।
এ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী অঞ্জন দাস। সে দলটির জেলা নির্বাহী সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। পেশায় ব্যবসায়ী অঞ্জন দাস দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের পাশে থেকেছেন, তাদের সংগ্রামকে নিজের লড়াইয়ে রূপান্তর করে তাদের এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এছাড়া অঞ্জন দাস সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতে সবর ভূমিকা পালন করেন। যার দরুন তরুণ ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন এই প্রার্থী।
সোনারগাঁকে অনেকেই হেফাজত অধ্যুষিত এলাকা বলে আখ্যায়িত করেন। ফলে এ আসনে ইসলামী দলগুলোর বড় একটি ভোটব্যাংক রয়েছে। এ আসনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ইসলামী ও সমমনা ১১ দলীয় জোটের নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থী দেয়া না হলেও জোটের দলগুলো তাদের প্রার্থী দিয়েছেন। যাদের রয়েছে পৃথক দলীয় ভোটব্যাংক।
জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে রয়েছে, জামায়াতে ইসলামের প্রার্থী মো. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মো. শাহজাহান, আমার বাংলাদেশ পার্টির প্রার্থী মো. আরিফুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী গোলাম মসীহ্ ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রার্থী মো. আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী।
জোটের প্রার্থী হিসেবে জামায়াতে ইসলামের প্রার্থী মো. ইকবাল হোসেন ভূঁইয়ার নাম আলোচনায় রয়েছে। তিনি দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসের শুরা সদস্য ও এডুকেশন সোসাইটি-এর পরিচালক।
ইকবাল হোসেন সোনারগাঁ উপজেলার জামপুর ইউনিয়নের শিরাব গ্রামের মো. হাবিবুর রহমান ভূঁইয়ার ছেলে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামি স্টাডিজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রী সম্পূর্ণ করেন। এছাড়া তিনি ঢাকা আলিয়া থেকে হাদীসে কামিল করেন। তিনি সোনারগাঁও আইডিয়াল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে বর্তমানে ও দায়িত্ব পালন করছেন।
সোনারগাঁয়ের সন্তান ও একটি কলেজের প্রধান শিক্ষক হিসেবে আসনটিতে তার আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তিনি জোটের প্রার্থী হলে মো. ইকবাল হোসেন ভোটের মাঠে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবেন।
ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হিসেবে এ আসনে রয়েছেন জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা গোলাম মসীহ। বর্তমানে তিনি ইসলামী আন্দোলনের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা। গোলাম মসীহ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সোনারগাঁয়ের সাবেক বিধায়ক মরহুম আব্দুল আউয়ালের তৃতীয় পুত্র।
গোলাম মসীহ সাবেক রাষ্ট্রদূত ও জাতীয় পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান বেগম রওশন এরশাদের রাজনৈতিক সচিব ছিলেন। ২০১৩ সাল পর্যন্ত জাতীয় পার্টির আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক বিষয়ক প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। ২০১৫ জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুলাই পর্যন্ত সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং ওআইসি’র স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সাবেক জাতীয় পার্টির নেতা হিসেবে গোলাম মসীহ কিছুটা ব্যাকফুটে থাকলেও সোনারগাঁয়ের সন্তান ও তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের কারণে রয়েছে তার বড় কর্মী-সমর্থক। যা ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে মনোনয়ন বাতিল হলেও ফের নিবাচনী মাঠে ফিরতে পারেন এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম। যাচাই-বাছাই পর্বে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়ন বাতিল করার সঙ্গে সঙ্গেই নির্বাচন কমিশনে আপিল করার কথা জানান। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনে তিনি আপিল করেছেন।
প্রবীণ এ বিএনপি নেতা নির্বাচনী মাঠে ফিরলে বদলে যাবে আসনটির নির্বাচনী সমীকরণ। কেননা রেজাইল করিম বিএনপির একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। দীর্ঘজীবন আসনটিতে রাজনীতি করার এখানে রয়েছে তার বিপুল সংখ্যাক কর্মী সমর্থক। এছাড়া ইতোপূর্বে তিনি এ আসনের জনপ্রিতিনিধি ও প্রতিমন্ত্রী হওয়ায় ভোটারদের মাঝেও রয়েছে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা।





































