০৫ মার্চ ২০২৬

হালিম আজাদ

প্রকাশিত: ১২:৩৮, ৫ মার্চ ২০২৬

১৩ বছরেও বিচার কেন হবে না?

১৩ বছরেও বিচার কেন হবে না?

৬ মার্চ ২০১৩ বিকেলে সুধীজন পাঠাগারে যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সড়ক থেকে মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে অপহরণ করা হয়েছিল। ঐ রাতেই ত্বকীর পিতা রফিউর রাব্বি নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় বিষয়টি উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরী করেন এবং র‌্যাব ১১ এর কার্যালয়ে চিঠি দেন। এর দুই দিন পর ৮ মার্চ সকালে শীতলক্ষ্যা নদীর খালের পাড় থেকে পুলিশ ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে। ৮ মার্চ রাতেই ত্বকীর পিতা বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় দণ্ড বিধি ৩০২/৩৪ ধারায় আসামী অজ্ঞাত উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন এবং ১৮ মার্চ জেলা পুলিশ সুপারের কাছে ত্বকী হত্যার জন্য তিনি শামীম ওসমান ও তার ছেলে অয়ন ওসমান সহ আটজনের নাম উল্লেখ করে একটি অবগতিপত্র দেন। তদন্তে মামলাটির আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় ২৮ মে ২০১৩ উচ্চ-আদালতের নির্দেশে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) ত্বকী হত্যা মামলাটির  তদন্তভার গ্রহণ করেন।

সে বছর ২৯ জুলাই ইউসুফ হোসেন লিটন এবং ১২ নভেম্বর সুলতান শওকত ভ্রমর নামে দুইজন ঘাতক আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দিতে তারা ত্বকীকে কখন, কী ভাবে, কোথায়, কারা কারা এবং কেন হত্যা করেছে তার বিশদ বর্ননা দেয়। তার বর্ননা অনুযায়ি অপহরণের রাতেই তারা ত্বকীকে প্রথমে গজারির লাঠি দিয়ে পিটিয়ে অজ্ঞান করে এবং পরে কালাম সিকদার নামের এক ঘাতক তার বুকের উপর উঠে গলা চেপে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে। রাত ১১টার মধ্যেই তারা ত্বকীকে হত্যা করে। পরে আজমেরী ওসমানের গাড়িতে করেই তারা ত্বকীর লাশ শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে নিয়ে যায় এবং নৌকায় করে নিয়ে নদীতে ফেলে দেয়।

৭ আগষ্ট র‌্যাব সে সময়ের সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানের উইনার ফ্যাশন খ্যাত টর্চারসেলে অভিযান পরিচালনা করে। সেখানে তারা দেয়ালে ও আসবাব পত্রে গুলির চিহ্ন দেখতে পান এবং সেখান থেকে রক্তমাখা প্যান্ট, দড়ি, রক্তমাখা গজারির লাঠি, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জামাদি, পিস্তলের অংশ সহ বিভিন্ন বস্তু আলামত হিসেবে সংগ্রহ করেন।

ত্বকী হত্যার ১ বছরের মাথায় ৫ মার্চ ২০১৪ র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হাসান র‌্যাবের প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমকে ত্বকী হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানান। তারা উল্লেখ করেন আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছে। হত্যার কারণ হিসেবে তারা তিনটি বিষয়কে উল্লেখ করেন, এক: ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষ শক্ত অবস্থান গ্রহণ, দুই: এর কিছু দিন পূর্বে গণ পরিবহনে শামীম ওসমান ও তার অনুগত লোকদের ব্যাপক চাঁদাবাজীর বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করে তার আন্দোলন, তিন: চিহ্নিত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভূমি দখলের প্রতিবাদে জনগণের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া। এ তিনটি কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা ত্বকীকে হত্যা করেছে বলে উল্লেখ করে র‌্যাব একটি অভিযোগপত্র তৈরী করেন এবং তা উপস্থিত সাংবাদিকদের সরবরাহ করেন। সংবাদ সম্মেলনের সে সংবাদ সে দিন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল প্রচার করে এবং পরদিন তা বিভিন্ন জাতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। র‌্যাব তখন অচিরেই এ অভিযোগপত্র আদালতে পেশকরা হবে বলে জানান। কিন্তু এর তিন মাস পর ৩ জুন জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওসমান পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতির কথা জানালে ত্বকী হত্যার সকল তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। 

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলে কয়েকজন উপদেষ্টা ত্বকী হত্যার বিচারের প্রতিশ্রুতি দেন। তদন্ত সংস্থা র‌্যাব কিছুটা তৎপর হয়ে ওঠে। নতুর করে কয়েক জন ঘাতককে তারা গ্রেপ্তার করে, কাজল হালদার নামে একজন ঘাতকের ১৬৪ ধারায় জবারবন্দি নেয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার দেড় বছর ক্ষমতায় থাকলেও মামলার তদন্তের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয় নি। তের বছরেও অভিযোপত্র আদালতে জমা পড়ে নি। ইতিমধ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির সরকার গঠিত হয়েছে। 

২০১৩ সালের মে মাসে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারায়ণগঞ্জ এসে ত্বকী হত্যার বিচার চেয়েছেন। তৎপরবর্তী সময় তিনি আরও একাধিক সমাবেশে ত্বকী হত্যার বিচার দাবি করেছেন। আমরা দেখলাম সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের কাচপুরের সমাবেশে বিএনপি প্রধান তারেক রহমান ত্বকীর হত্যার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি এখন রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর। আমরা আশা করছি বর্তমান সরকার ত্বকী হত্যার বিচারে আন্তরিক হবে।

ত্বকী হত্যার বিচারের দাবিতে বিশ্বের ২২ টি দেশে প্রতিবাদ হয়েছে। এ বিচারের দাবিতে টানা ১৩ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে সমাবেশ, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, আলোকপ্রজ্বালন, গোলটেবিল বৈঠক, প্রতীক অনশন সহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। দেশের লেখক, শিল্পী, বিুদ্ধিজীবীগণ প্রতিনিয়ত লেখালেখি, কবিতা, ছবিআাঁকা, গান রচনা, প্রমাণ্যচিত্র নির্মাণ, স্মারক গ্রন্থ, গান ও আবৃত্তির সিডি প্রকাশ সহ বিভিন্ন ভাবে এ হত্যার বিচার চেয়ে আসছেন। ২০১৩ সালের ৮ মার্চ ত্বকীর লাশ পাওয়ার তারিখটিকে কেন্দ্র করে ১৩ বছর ধরে টানা প্রতি মাসের ৮ তারিখ আলোকপ্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করে আসছে। কোন হত্যাকাণ্ডর বিচারের দাবিতে এভাবে টানা আন্দোলন, সারাদেশ সহ বিশ্বে কতটা নজির রয়েছে আমাদের জানা নেই। 

আজকে রাষ্ট্রে সংগঠিত বিভিন্ন ঘটনাবলীর মধ্যদিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির নগ্ন বহিপ্রকাশ পরিলক্ষিত হচ্ছে। পূর্ববর্তী সরকারগুলোর কারণে আজকে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অবিশ্বাস ও অনাস্থা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে রাষ্ট্রের এ শক্তিশালী স্তম্ভটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। বিচার ব্যবস্থা ও সুশাসন ধ্বংস হলে রাষ্ট্রের আর গণতান্ত্রিক চরিত্র অবশিষ্ট থাকে না, রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে আমরা দেউলিয়া দেখতে চাই না। আর চাইনা বলেই আর বিলম্ব না করে ত্বকী হত্যার অভিযোগপত্র দ্রুত আদালতে জমা দিয়ে বিচার শুরু করার দাবি জানাচ্ছি।

হালিম আজাদ : কবি, সাংবাদিক, সদস্য সচিব, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ 

সর্বশেষ

জনপ্রিয়