নারায়ণগঞ্জে মাদক বিস্তার উদ্বেগজনক: সমাধান দিবে কে?
শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ-এ মাদক পরিস্থিতি দিন দিন উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে মাদকের সহজলভ্যতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। অনেক এলাকায় প্রকাশ্যেই মাদক বিক্রি হচ্ছে, আবার কোথাও গোপন চক্রের মাধ্যমে রমরমা ব্যবসা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাবুরাইল, নিতাইগঞ্জ, দেওভোগ, টানবাজার, আমলাপাড়া সহ শহরের বিভিন্ন এলাকা এবং ফতুল্লা অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ব্যবসা চলছে। এসব এলাকায় মাদক কারবারের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের শেল্টারের অভিযোগও রয়েছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চললেও মাদকের বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে বক্তব্য দিতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। আমরা শতভাগ নির্মূল করতে পারছি না। তাই এ ধরনের অভিযোগ আসছে বা সামনেও আসবে। তবে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।”
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদে মাদক সমস্যা সমাধানে সমাজের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
মাদকের বিস্তার নিয়ে অভিভাবকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, মাদকের কারণে অনেক তরুণ পড়াশোনা ছেড়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে এবং অপরাধ প্রবণতাও বাড়ছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে, অন্যদিকে শ্রমজীবী যুবকদের কর্মক্ষমতাও কমে যাচ্ছে।
এদিকে নির্বাচনী সময় সোনারগাঁয়ে এক জনসভায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নারায়ণগঞ্জ শহর ও আশপাশে অন্তত ২০টি স্থানে প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা চলে বলে উল্লেখ করেন এবং কঠোর হাতে তা দমনের ঘোষণা দেন। গত ২৬ জানুয়ারির সেই বক্তব্যের পর তাঁর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলেও আলোচিত ‘২০টি মাদক স্পট’-এ একযোগে অভিযান কবে শুরু হবে—তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বিষয়টি নিয়ে নগরজুড়ে আলোচনা চলছে।
স্থানীয়দের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শহরে সংঘবদ্ধ মাদক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এলাকাভিত্তিকভাবে কিছু চক্র মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঝে মাঝে কিছু কারবারি গ্রেপ্তার হলেও মূল নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই আবার একই এলাকায় মাদক ব্যবসা সক্রিয় হয়ে ওঠে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, মাদক ব্যবসা এখন সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং এসব চক্রের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। তাই শুধু খুচরা বিক্রেতাদের ধরলে সমস্যার সমাধান হবে না; মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, মাদক নির্মূলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। তিনি দাবি করেন, তাদের দল মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে রয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসন যদি মাদক সরবরাহের নির্দিষ্ট রুটগুলোতে অভিযান জোরদার করে, তাহলে ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি বলেন, শহরের কোথায় কোথায় মাদকের স্পট রয়েছে তা অনেকেই জানেন, কিন্তু সে অনুযায়ী কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার বাড়ছে। তিনি মনে করেন, মাদক দমনে প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও আন্তরিকতা থাকতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাদক শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব ফেলছে। মাদক বিস্তারের কারণে ছিনতাই, চুরি ও কিশোর অপরাধ বাড়ছে। তাই নারায়ণগঞ্জকে মাদকমুক্ত করতে প্রশাসন, রাজনীতিবিদ এবং সমাজের সব স্তরের মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, শহরে মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও এর কার্যকর সমাধান কবে এবং কীভাবে আসবে—সে প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে নগরবাসীর প্রশ্ন, নারায়ণগঞ্জে মাদকের বিস্তার রোধে সমাধান দেবে কে?





































