১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ:

প্রকাশিত: ১৯:৪২, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

নারায়ণগঞ্জে বাজিমাত করতে পারেন স্বতন্ত্ররা

নারায়ণগঞ্জে বাজিমাত করতে পারেন স্বতন্ত্ররা

নির্বাচনী মাঠে শেষ মুহূর্তে এসে হিসাব উল্টে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। একাধিক আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থীদের পাশাপাশি প্রভাবশালী ও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন তারা। মাঠপর্যায়ে টক্কর দিয়ে প্রচারণা চালানো, স্থানীয় নেতাকর্মী ও ভোটারদের দৃশ্যমান সমর্থন এবং ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে কোনো কোনো আসনে ধানের শীষের প্রার্থীদের চেয়েও বেশি আলোচনায় স্বতন্ত্ররা। এ অবস্থায় বিশ্লেষকদের ধারণা, বেশ কয়েকটি আসনে চমক দেখিয়ে বাজিমাত করতে পারেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই।

রাজধানী ঢাকা লাগোয়া, শিল্প-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জ জেলা পাঁচটি সংসদীয় আসনে বিভক্ত। আসনগুলোতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, ইসলামী আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাসদ, সিপিবি, রিপাবলিকানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মোট ৪৮ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যার মধ্যে শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে আছেন ৪৪ জন প্রার্থী।

ভোটের সমীকরণ অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের পাঁচ আসনেই বিএনপি মনোনীত ও জোটের প্রার্থীরা এগিয়ে থাকলেও তাদের জোর টক্কর দিচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। নির্বাচনী এলাকায় যাদের প্রভাব, পরিচিতি, রাজনৈতিক কর্মীবাহিনী, সমর্থক ও ব্যাপক জনপ্রিয়তাও রয়েছে। এসব প্রার্থীরা নির্বাচনের শুরু থেকেই ভোটের মাঠে সক্রিয় ছিলেন। অনেকে তাদের প্রচার-প্রচারণা, আশ্বাস, নির্বাচনি ইশতেহারের মধ্যে দিয়ে ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়ও হয়ে উঠেছেন।

নারায়ণগঞ্জ-৫

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১১ থেকে ২৭ নম্বর ওয়ার্ড এবং বন্দর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন—বন্দর, কলাগাছিয়া, মুছাপুর, ধামগড় ও মদনপুর নিয়ে আসনটি গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন। আসনটিতে নয় রাজনৈতিক দল ও একজন স্বতন্ত্রসহ মোট ১০ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এ আসনেরই তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ। তিনি ভোটের মাঠে এগিয়ে থাকলেও তাকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা দিচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন।

নির্বাচনের শুরুতে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত না হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন এখন আবুল কালামের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান হয়ে এবার সংসদ সদস্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি। দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে দলটির তৎকালীন সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় বহিষ্কৃত হন তিনি। প্রভাবশালী ওসমান বলয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচন করে ও জয়ী হয়ে তিনি ভোটের মাঠে নিজের সক্ষমতা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছেন। সেই নির্বাচনের কারণে ওসমানবিরোধী ভোটের একটি অংশ এখনো তার সঙ্গে রয়েছে।

এছাড়া বন্দরে দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি থাকার সুবাদে তার রয়েছে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা ও মাঠপর্যায়ে নিজস্ব কর্মীবাহিনী। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেমে সুসংগঠিত প্রচারণার মাধ্যমে ভোটের মাঠে জনপ্রিয়তা তৈরি করতে পেরেছেন এই প্রার্থী। বিগত দিনের একাধিক শো-ডাউন করে তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছেন, যা ভোটের মাঠে তার শক্তি প্রদর্শন করে।

নারায়ণগঞ্জ-৪

সদর উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন-ফতুল্লা, কুতুবপুর, বক্তাবলী, কাশীপুর, এনায়েতনগর, গোগনগর ও আলীরটেক নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৪ সংসদীয় আসন। জেলার সর্বোচ্চ ১৩ জন প্রার্থী এই আসনেই। তবে তাদের মধ্যে দুজন ইতোমধ্যে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে সরাসরি কোনো প্রার্থী না দিয়ে জোটের শরিক দলের জন্য ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। জোটের প্রার্থী জমিয়াতে উলামায়ে ইসলামের হয়ে বিএনপির অনেক প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের নিয়ে নির্বাচনি মাঠে থাকলেও এই প্রার্থীকে টক্কর দিচ্ছেন বিএনপিরই বিদ্রোহী একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী।

আসনটিতে মনির হোসেন কাসেমীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছেন সাবেক বিএনপি নেতা শাহ আলম। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন এবং একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। তবে ফতুল্লা অঞ্চলে বেশ প্রভাব রয়েছে তার। প্রতিষ্ঠিত দলীয় নেতাকর্মীদের অনেকেই তার পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন দীর্ঘকাল। ফলে তাদের একটি বড় অংশ কাজ করছে শাহ আলমের পক্ষে, যার জন্য বেশ কয়েকজন নেতা সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তাছাড়া তার পারিবারিক পরিচিতিও রয়েছে। বাবা হাজী উদ্দিনও ছিলেন বিএনপির সংসদ সদস্য।

এছাড়াও রয়েছেন আসনটির সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। তিনি নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি পরিচিত মুখ, যিনি জেলায় দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং আওয়ামী লীগের সময়ে শতাধিক রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়েছেন। ফলে এ আসনে তার ব্যাপক প্রভাব, কর্মী-সমর্থক ও জনপ্রিয়তা রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ-৩

ঐতিহ্যবাহী সোনারগাঁ উপজেলা ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আসনটির নির্বাচনী সমীকরণ অনুযায়ী, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান এগিয়ে থাকলেও বিজয়ী হতে হলে শেষ লড়াই করতে হবে স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে।

মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতা ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন। দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় সম্প্রতি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলার সাবেক সভাপতি ছিলেন।

নির্বাচনের শুরু থেকেই আসনটিতে শক্ত অবস্থানে গিয়াস উদ্দিন। ধানের শীষের প্রার্থীর সঙ্গে সমান তালে প্রচারণা চালিয়েছেন। আজহারুল ইসলাম মান্নানের প্রচারণা বেশি দলীয়কেন্দ্রিক ছিল, অন্যদিকে গিয়াস উদ্দিনের প্রচারণা অনেকটাই ব্যক্তিগত অনুসারী ও পুরোনো রাজনৈতিক নেটওয়ার্ককেন্দ্রিক।

দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ও সাবেক এমপি হওয়ার সুবাদে তার ব্যাপক কর্মীবাহিনী রয়েছে। দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরও এই কর্মীরা দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে তার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এর জন্য তাদের অনেকে বহিষ্কৃতও হয়েছেন। এছাড়া তিনি সিদ্ধিরগঞ্জের জনপ্রতিনিধি থাকায় এখানে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। রাজনৈতিক দিক থেকেও সিদ্ধিরগঞ্জকে গিয়াস উদ্দিনের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

নারায়ণগঞ্জ-২

আড়াইহাজার উপজেলা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ আসনে জেলার সবচেয়ে প্রভাবশালী বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম আজাদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। দলের দুঃসময়ে আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় নেতা, স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ও প্রতিপত্তিশালী একজন শক্ত প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ। তবে এ আসনে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দিচ্ছেন আরেক হেভিওয়েট নেতা ও দুইবারের সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুর, যিনি দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সম্প্রতি বহিষ্কৃত হয়েছেন।

আড়াইহাজারের প্রবীণ বিএনপি নেতা আতাউর রহমান আঙ্গুর দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ক্লিন ইমেজের দুইবারের সাবেক এই সংসদ সদস্যের রয়েছে নিজস্ব ভোটব্যাংক ও অনুসারী। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় অনেক বিএনপি নেতাকর্মী প্রকাশ্যে তার পক্ষে অবস্থান নিতে না পারলেও মাঠে তার পক্ষে শক্ত মৌন সমর্থন রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পাশাপাশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের একটি বড় অংশও তিনি পেতে পারেন—এমন আলোচনা মাঠপর্যায়ে রয়েছে।

অন্যদিকে আজাদপন্থী কিছু নেতাকর্মীর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড আঙ্গুরের পক্ষে কাজ করতে পারে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আড়াইহাজারে সংঘটিত একাধিক সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি ও মামলা বাণিজ্যের ঘটনায় আজাদপন্থী কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে, যা স্থানীয় রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। সর্বশেষ গত ৯ জানুয়ারি আড়াইহাজারের কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নে যৌথ বাহিনীর অভিযানে উপজেলা ছাত্রদল নেতার পৈতৃক বাড়ি থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়। ওই ছাত্রদল নেতা আজাদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।

নারায়ণগঞ্জ-১

জেলার পাঁচ আসনের মধ্যে একমাত্র নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে নির্ভার বিএনপি। রূপগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট সাত প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে রয়েছে মাত্র পাঁচ প্রার্থী।

আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপুর বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন তারই দলের যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. দুলাল হোসেন। তবে সম্প্রতি তিনিসহ দুজন তাকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

এছাড়া আসনটিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার হোসেন মোল্লা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. ইমদাদুল্লাহ, সিপিবির মনিরুজ্জামান চন্দন এবং ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. রেহান আফজাল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটের মাঠে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেননি তারা।

ফলে ভোটের দিন শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় ধানের শীষের প্রার্থী দিপু ভূঁইয়া রেকর্ড সংখ্যক ভোটে বিজয়ের পথে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়