টানা বৃষ্টিতে স্থবির জীবিকার চাকা, বিপাকে খেটে খাওয়া মানুষ
টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে নারায়ণগঞ্জে জনজীবন অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। বর্ষণের কারণে নগরবাসী কিছুটা গরম থেকে স্বস্তি পেলেও চরম দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ। রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচল কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন সড়কে পানি জমে থাকায় দিনমজুর, রিকশাচালক ও ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
নগরীর চাষাঢ়া ও আশপাশের এলাকায় ঝুড়িতে করে কলা বিক্রি করেন দুলাল। ২০১০ সালে বরিশাল থেকে নারায়ণগঞ্জে এসে সপরিবারে বসবাস শুরু করেন তিনি। ছেলে একটি গার্মেন্টস কারখানায় চাকরি করলেও সংসারের বাড়তি খরচ মেটাতে এই বয়সেও তাকে রাস্তায় নেমে ব্যবসা করতে হয়।
দুলাল বলেন, “বৃষ্টির কারণে কাস্টমার একদম নেই। আগে পুলিশ লাইনের পাশে একটি ফাস্টফুডের দোকান ছিল। সেখানে বিক্রি কমে যাওয়ায় এখন কলার ব্যবসা করছি। কিন্তু এই বৃষ্টিতে সেটাও ঠিকমতো করতে পারছি না।”
চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে দেখা যায় কিশোর হকার রাজিবকে। ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী এই কিশোর ছোট একটি মানিব্যাগের দোকান বসিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। টানা বৃষ্টিতে গত দুই দিন ধরে নিয়মিত দোকান খুলতেই পারছে না সে।
রাজিব জানায়, বৃষ্টির দিনে দোকান রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বড় একটি ছাতা কেনার সামর্থ্য তার নেই। আক্ষেপ করে সে বলে, “বৃষ্টি না থাকলে দিনে দুই থেকে তিন হাজার টাকা বিক্রি হয়। কিন্তু এখন সেটা ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। একটা বড় ছাতা খুব দরকার। আজ যদি এক হাজার টাকা আর কাল পাঁচশ টাকা আয় করতে পারি, তাহলে একটা বড় ছাতা কিনব।”
বৃষ্টির দুর্ভোগের আরেকটি চিত্র দেখা যায় নগরীর করিম মার্কেট এলাকায়। সেখানে বিকল হয়ে যাওয়া ব্যাটারিচালিত মিশুক একাই টেনে গ্যারেজে নিয়ে যাচ্ছিলেন ষাটোর্ধ্ব তাইজুল ইসলাম। কুমিল্লা থেকে এসে গত আট বছর ধরে নারায়ণগঞ্জে বসবাস করছেন তিনি। প্রায় ২০ বছর রিকশা চালিয়ে সংসার চালানোর পর বয়সের কারণে এখন ব্যাটারিচালিত মিশুক চালান।
তিনি জানান, দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে গাড়ির পিকআপ ও মোটরে পানি ঢুকে সেটি বিকল হয়ে যায়। এরপর প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে একাই মিশুকটি টেনে গ্যারেজে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
তাইজুল ইসলাম বলেন, “বয়সের কারণে গাড়ি টানতেও কষ্ট হচ্ছে। কয়েকজন চালককে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা ভাড়া দেওয়ার কথা বলেছিলাম, কিন্তু ভোলাইলের রাস্তায় হাঁটুসমান পানি থাকায় কেউ রাজি হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “আজ সারাদিনে মাত্র ১২০ টাকা আয় করেছি। অথচ প্রতিদিন গ্যারেজ মালিককে ৫০০ টাকা জমা দিতে হয়। আজ জমার টাকাই উঠেনি। আমার তিনটি মেয়ে, কোনো ছেলে নেই যে এসে সাহায্য করবে। ফলপট্টি থেকে টানবাজার, মিনাবাজার, মণ্ডলপাড়া পুল হয়ে ভোলাইলের গ্যারেজ পর্যন্ত গাড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছি। ঘরে স্ত্রী অসুস্থ, মেয়েরা মাদ্রাসায় পড়ে। পুরো সংসারটাই এই মিশুকের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। আগে মোটরচালিত রিকশা চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনার পর মিশুক চালানো শুরু করি। আজ বৃষ্টি সেই রোজগারও কেড়ে নিয়েছে।”
টানা বর্ষণে শুধু দুলাল, রাজিব কিংবা তাইজুল ইসলাম নন, নগরীর হাজারো নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের একই অবস্থা। রাস্তাঘাটে জমে থাকা পানি, কাদা এবং মানুষের কম চলাচলের কারণে তাদের আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকেই বলছেন, প্রতিদিন যা আয় হয়, তা দিয়েই পরিবারের খাবার জোটে। ফলে একদিন কাজ না থাকলেই অনিশ্চয়তায় পড়ে যায় পুরো পরিবার।
টানা বর্ষণের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন-জীবিকা এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে। তাদের প্রত্যাশা, আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরবে নগরীতে এবং স্বাভাবিক হবে তাদের জীবিকার চাকা।





































