মাসদাইর যেন ‘ভয়ংকর’ সেই জঙ্গল সলিমপুর
গভীর রাতে দুই হাতে বাজার নিয়ে মাসদাইরের সরকারি তোলারাম কলেজ সংলগ্ন আল্লামা ইকবাল রোড দিয়ে হেঁটে বাড়িতে যাচ্ছিলেন এক দম্পতি। ফাঁকা রাস্তায় মোটর সাইকেলের আলো দেখে আগেই বিপদ আঁচ করতে পেরে চিৎকার দিয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা তাদের। তবে মুখোশ পরা তিন ছিনতাইকারী মোটর সাইকেল থেকে নেমে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে সব ছিনিয়ে নিয়ে যায় ওই দম্পতির কাছ থেকে। সিসি ক্যামেরায় ছিনতাইয়ের সেই দৃশ্য দেখে যে কেউর গা শিউরে উঠবে। তবে রাত গভীর হলে মাসদাইরের সড়কগুলোতে ছিনতাই এখন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই না, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং, মাদক ও ইন্টারনেট-ক্যাবল ব্যবসা নিয়ে অপরাধীদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রশাসনকেও। গত দুই বছরে মাসদাইরের বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের ধরতে গিয়ে একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা। সব মিলিয়ে এখন মাসদাইর যেন হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের সেই ভয়ঙ্কর জঙ্গল সলিমপুর। যেখানে অপরাধীদের বাহিরে অন্য কারো কিছুই চলেনা।
পুলিশের ভাষ্য, মাসদাইরে একাধিক অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। মূলত মাদক কেনাবেচাকে কেন্দ্র করেই এই এলাকায় অপরাধের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে বলে দাবি তাদের।
স্থানীয়রা জানান, ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরী সংলগ্ন এনায়েত নগর ইউনিয়নের শ্রমিক অধ্যুষিত ঘোষেরবাগ, ফারিয়ার মোড় ও গুদারাঘাট এলাকা মাসদাইরের সবচেয়ে অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। এর বাইরে লিচুবাগ, গলাচিপা, বোয়ালিয়া খাল, তালা ফেক্টরির মোড় এবং নাসিকের আওতাধীন মাসদাইর বাজারসহ আশপাশের এলাকাগুলোতেও অপরাধ থামছে না।
জানা যায়, গত ১৩ জুন রাতে মাসদাইরের পেতঙ্গার মোড় এলাকার সন্ত্রাসী ফাইটার মিনেরর আস্তানায় অভিযান পরিচালনা করে ফতুল্লা থানা পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে আটক করা হলে আসামী ছিনিয়ে নিতে পুলিশের উপর হামলা করে সন্ত্রাসীরা। এ সময় চার থেকে পাঁচ রাউন্ড গুলির শব্দও শোনা যায়।
এর আগে ৫ মে দুপুরে মাসদাইরের বোয়ালিয়া খাল এলাকায় মাদক সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে এসে সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হন তিন র্যাব সদস্য। এ সময় র্যাব সদস্যদের প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়।
২০২৫ সালের ১৬ মে মাসদাইরের গাইবান্ধা বাজার এলাকায় অভিযান চালাতে গেলে র্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে মাদক কারবারিরা। সেই গোলাগুলিতে পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক নারী গুলিবিদ্ধ হন। এর কিছুদিন আগে মাসদাইর বাজার এলাকায় এক বিএনপি নেতাকে লক্ষ্য করে তিন রাউন্ড গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। একের পর এক এই হামলা ও গুলির ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্থানীয় মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসী জাহিদ এবং তার সহযোগীদের নাম উঠে আসছে।
গত ২৩ মে রাতে মাসদাইর গুদারাঘাট এলাকায় এক পোশাক ব্যবসায়ীর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে চশমা সাব্বির বাহিনী। দাবি পূরণ না হওয়ায় তার ব্যক্তিগত গাড়ির চালককে কুপিয়ে আহত করা হয়। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে সাব্বিরের বাড়িতে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযান পরিচালিত হলে তাকে পাওয়া না গেলেও বাসা থেকে দেশীয় অস্ত্র, চকলেট বোমা, ড্রোন, সিসি ক্যামেরা, ৩ হাজার পিস ইয়াবা ও গাঁজা উদ্ধার করে পুলিশ।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৃহত্তর মাসদাইরে বর্তমানে তিনটি সন্ত্রাসী গ্রুপ মাদক ব্যবসার নেপথ্যে সক্রিয় রয়েছে। মাদকের সরবরাহ থেকে শুরু করে বিক্রি; সবই নিয়ন্ত্রণ করে এই তিন চক্র। এলাকাভিত্তিক ভাগ করে নিজেদের কারবার পরিচালনা করেন তাদের প্রধানরা। ফারিয়ার মোড়, গাইবান্ধা বাজার, ঘোষেরবাগ, লিচুবাগ ও গলাচিপার কিছু অংশে মাদক বিক্রির নিয়ন্ত্রণ জাহিদের হাতে। মাসদাইর বাজার, বেগম রোকেয়া স্কুলের মোড় ও ছোট কবরস্থান এলাকায় মাদকের বড় ডিলার কসাই সেলিম। আর গুদারাঘাট, হাজীর মাঠ ও মিস্ত্রীবাগ এলাকা রয়েছে সাঁঝবর ওরফে চশমা সাঁঝবরের দখলে। তবে সম্প্রতি চাঁদাবাজির মামলায় আদালতে জামিন চাইতে গিয়ে গ্রেফতার হন চশমা সাঁঝবর।
মাদক ও চাঁদাবাজির পাশাপাশি ইন্টারনেট ও ক্যাবল ব্যবসার আধিপত্য নিয়েও এলাকায় প্রতিনিয়ত সংঘাত লেগেই থাকে। ২০২৩ সালে মাসদাইরের সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে ইন্টারনেট ব্যবসায়ী ইফাদুর রহমান তুষারের বাড়িতে হামলা চালায় জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাফেল প্রধানের অনুসারীরা। তুষার ছাত্রলীগের আরেক নেতা বাশীরের অনুসারী হিসেবে মাসদাইরের বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবসা পরিচালনা করতেন। কিন্তু প্রভাব বিস্তার করে রাফেল তার ব্যবসা দখল করে নিতেই সেদিন হামলা চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছিলেন তুষার। এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, ইন্টারনেট ও ক্যাবল ব্যবসা নিয়ে এখনো মাসদাইরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
নাসিকের ১৩ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ নিজেও এই এলাকারই বাসিন্দা। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, যেখানে পুলিশের ওপরই হামলা হয়, সেখানে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার অবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। তিনি মনে করেন, মাসদাইরে এখন প্রশাসনের কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে। পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে।
তিনি আরও জানান, রাত নামলেই এলাকার প্রতিটি অলিগলিতে ছিনতাইকারীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। গত কয়েক দিনেই দশটারও বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। পুলিশের টহল ও গাড়ির সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি পুরনো কৌশল বদলানোরও দাবি জানান তিনি। তার ভাষায়, মাসদাইরের মানুষ আজ নিজের এলাকায়ই সন্ত্রাসীদের কাছে জিম্মি হয়ে বাঁচছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী বলেন, এখানে বেশ কয়েকটি অপরাধী চক্র রয়েছে। তবে মাসদাইরের বেশ কয়েকজনকে মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের আমরা ইতিমধ্যে আইনের আওতায় এনেছি। বাকিদেরও দ্রুত গ্রেফতার করা হবে। তবে এখানে পুলিশের পাশাপাশি সামাজিক ভাবেও স্থানীয়দের অনেক কিছু করার আছে।





































