“আমরা এতিম হয়ে গেলাম ভাই”
গত বছর যকৃতের জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান সাব্বিরের মা রাবেয়া বেগম। তিন ভাই তখন পেশায় বাবুর্চি বাবা রায়হান মোল্লাকে ঘিরেই দিন যাপন করছিলেন। সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাতে সাব্বিরের বাবাকে রাস্তার উপর কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
পিতার এমন নির্মম মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ ২৩ বছর বয়সী সাব্বির। বাবা হারানোর মধ্য দিয়ে অভিভাবকহীন হয়ে পড়া সাব্বিরের অপর দুই ভাইও শোকে কাতর। নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের লাশঘরের সামনে কাঁদছিলেন তিনজনই।
“এক বছর আগে মা লিভার (যকৃৎ) নষ্ট হয়ে মারা গেছে। আজ সন্ত্রাসীদের হাতে বাবাকে হারাইয়া এতিম হইয়া গেছি ভাই”, কথাটি শেষ করার আগেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন সাব্বির।
রাত আনুমানিক সাড়ে আটটায় ইসদাইর রেল লাইন এলাকায় রাস্তার উপর এলোপাথারি কোপানো হয় ৫০ বছর বয়সী রায়হান মোল্লাকে। তিনি নগরীর গলাচিপার প্রয়াত মেছের আলীর ছেলে।
জামতলা এলাকার হীরা কমিউনিটি সেন্টারে বাবুর্চির কাজ করতেন রায়হান। তিন ছেলেকে নিয়ে তল্লা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।
ফতুল্লা মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবু রায়হান বলেন, কয়েকজন ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র দিয়ে রায়হান মোল্লাকে রাস্তার উপর এলোপাথারি কুপিয়ে চলে যায়। স্থানীয় লোকজন পরে তাকে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালে নিয়ে আসেন এবং সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রায়হান মোল্লাকে কোপানোর খবর তার সন্তানরা পেয়েছেন বেশ কিছুক্ষণ পর। শুনেই উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে গেছেন ইসদাইর এলাকায়। কিন্তু সেখানে কাউকে না পেয়ে ছোটেন হাসপাতালের দিকে। পরে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের লাশঘরে নিথর দেখ পান বলে জানান নিহতের আরেক ছেলে ফয়সাল।
হাসপাতালে পরিচিত একজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁন্নার সময় ফয়সাল বলছিলেন, “আমার বাপেরে মাইরা ফালাইছে। আমাদের আর কেউ রইলো না রে ভাই, আমাগো আর কেউ রইলো না।”
কিছুটা ধাতস্থ হলে ফয়সালের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। রায়হানের এ ছেলে জানান, বাবার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছে আগের রাতে। সকালে বাবা আগেই কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাওয়াতে কথা হয়নি। কিন্তু রাতে একত্রে খাবার কথা ছিল।
“সকালে কথা হয় নাই। কথা ছিল আজকে আমরা সবাই একসাথে রাতের খাবার খাবো। তাই তারাতারি কাজ শেষ করে বাসায় আইছিলাম...আমাদের আর কেউ থাকলো না ভাই। আমরা ভাইরা এতিম হইয়া গেলাম।”
নিহতের ছেলেদের অভিযোগ, কয়েকদিন আগে চাষাঢ়া রেলস্টেশনে অস্থায়ী খাবারের দোকান দিতে চেয়েছিলেন বাবুর্চি রায়হান মোল্লা। কিন্তু সেটি স্থাপন করতে গেলে বাধা দেয় রাজ্জাক নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি। দোকান দিতে হলে চাঁদা দিতে হবে বলে জানান। পরে এ নিয়ে তর্কের জেরে রাজ্জাক তার বাবাকে ছুরিকাঘাত করে বলেও অভিযোগ করেন।
"রাজ্জাক মাদক ব্যবসায়ী। তার অনেক লোকজন আছে, ওগুলাও মাদকসেবী। এই কারণে এইসব নিয়া আমরা আর বাড়াবাড়ি করি নাই। বাবারেও কইছি, এইটা নিয়া ওর সাথে আর কথা বলতে না।”
ওই শত্রুতার জেরেই রাজ্জাক তার লোকজন নিয়ে রায়হান মোল্লাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়েছে বলে সন্দেহ তার ছেলেদের।
ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মান্নান বলেন, “ঘটনাটি পূর্ব শত্রুতার জেরে হয়েছে বলে ধারণা করছি। নিহতের পরিবারের লোকজন কয়েকজনের নাম বলছেন, বিষয়টি আমরা তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করে দেখবো। ঘটনাস্থল ও আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করছি। জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করা হবে।”
এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হবে বলেও জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।





































