০৫ মার্চ ২০২৬

সৌরভ হোসেন সিয়াম

প্রকাশিত: ২১:৫৯, ৫ মার্চ ২০২৬

ত্বকী হত্যার ১৩ বছর: সরকার বদলায় শেষ হয় না তদন্ত

ত্বকী হত্যার ১৩ বছর: সরকার বদলায় শেষ হয় না তদন্ত

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো শুরু হয়নি বিচারকাজ। তিন দফা সরকার পরিবর্তন, তদন্তের নানা আশ্বাস এবং নতুন করে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটলেও অভিযোগপত্র জমা না পড়ায় মামলাটি এখনও তদন্ত পর্যায়েই আটকে আছে। ফলে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন ত্বকীর পরিবার।

দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের (র‌্যাব) দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এখনো বলতে পারছেন না- ঠিক কবে নাগাদ তারা অভিযোগপত্র আদালতে জমা দিবেন।

যদিও গত ৮ জানুয়ারি এ মামলাটির শততম শুনানিতে বাদীপক্ষের আবেদনে আদালত ৩০ দিনের মধ্যে মামলাটির তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিলের নির্দেশ দেয় র‌্যাবকে।

নিহত ত্বকীর পিতা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান ও তার পরিবারের সদস্যরা জড়িত থাকায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এই মামলার কার্যক্রম বন্ধ ছিল। গণঅভ্যুত্থানের মুখে হাসিনা সরকারের পতনের পর একমাসের ব্যবধানে এ মামলায় ছয়জনের গ্রেপ্তার ন্যায়বিচারের আশা জাগিয়েছিল পরিবারে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হলেও তদন্ত শেষ হয়নি।

“শেখ হাসিনা ওসমান পরিবারকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকার কাকে রক্ষা করতে চেয়েছে, জানি না। কিন্তু বিচারটা হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত শেষ করতে তাগিদ দেওয়া হলেও সংস্থাগুলো কেন তা করেনি তা একটি প্রশ্ন হিসেবেই রয়ে গেছে”, বলেন রাব্বি।

তবে, বর্তমান বিএনপি সরকারের কাছেও বিচারের আকাক্সক্ষাই রাখেন বলে জানান তিনি।

২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ শহরের বাসা থেকে বেরিয়ে স্থানীয় একটি পাঠাগারের সামনে থেকে অপহরণ হন ১৭ বছর বয়সী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। পরদিন তার 'এ' লেভেল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়। যেখানে দেখা যায় ত্বকী পদার্থবিজ্ঞানে ৩০০ নম্বরের মধ্যে সারা পৃথিবীতে সর্বোচ্চ ২৯৭ পেয়েছিলেন।

তবে, অসাধারণ এই ফলাফল জানতে পারেনি ত্বকী। ৮ মার্চ সকালে শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে অনন্য মেধাবী এই কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

ত্বকী হত্যার বর্ষপূর্তির একদিন আগে ২০১৪ সালের ৫ মার্চ সংবাদ সম্মেলন করে র‌্যাব জানিয়েছিল, এই হত্যা মামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করতে পেরেছেন তারা। যেকোনো দিন আদালতে জমা পড়বে অভিযোগপত্র।

কিন্তু গত এক যুগেওৃ সেই ‘যেকোনো দিন’ আর আসেনি।

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলাটি খানিকটা গতি পায়। র‌্যাব সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে অভিযান চালিয়ে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে এবং জানায়, তারা সবাই আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠজন।

আজমেরী ওসমান প্রয়াত সংসদ সদস্য একেএম নাসিম ওসমানের ছেলে ও সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ভাতিজা।

গ্রেপ্তার ছয়জনের মধ্যে আজমেরীর সহযোগী কাজল হাওলাদার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছেন। আজমেরীর গাড়িচালক মো. জামশেদ, আত্মীয় আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে জামাই মামুন, সহযোগী শাফায়েত হোসেন শিপন, মামুন মিয়া ও ইয়ার মোহাম্মদ এ মামলায় গ্রেপ্তার হলেও পরে তারা জামিনে বেরিয়ে আসেন।

ওই বছরের সেপ্টেম্বরে মামলাটির অগ্রগতি নিয়ে আলাপকালে তৎকালীন র‌্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানভীর মাহমুদ পাশা বলেছিলেন, ‘প্রচ্ছন্ন চাপে’ অনেক বছর আটকে থাকলেও তারা এখন মামলাটির তদন্ত দ্রুত শেষ করতে চান। তিন মাসের মধ্যে মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেটাও সম্ভব হয়নি।

গত ৫ মার্চ এই হত্যা মামলার নথিপত্র ১০২ বারের মতো আদালতে উঠেছে, কিন্তু অভিযোগপত্র জমা পড়েনি। আদালত এদিনও র‌্যাবকে দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়ার তাগিদ দিয়েছে।

তবে, ইতোমধ্যে তদন্তকারী সংস্থাটির অধিনায়ক এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দু’জনই বদলি হয়েছেন।

র‌্যাবের বর্তমান অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচএম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “আমাদের তদন্ত চলমান আছে। তদন্ত শেষ হলে সিস্টেম অনুযায়ী আদালতে প্রতিবেদনও দাখিল করা হবে।”

তবে, তদন্ত শেষ করতে আরও কতদিন লাগতে পারে সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলেননি এ কর্মকর্তা।

ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়ে এখনও আশাবাদী ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি। তিনি বলেন, “আমরা আশা করি, বিএনপি সরকার অন্তত বিচার বন্ধ রাখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসবে। এবং ত্বকী হত্যার বিচারকাজ শুরু করবে।”

২০১৩ সালের ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর রফিউর রাব্বি বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন।

ওই বছরের ১৮ মার্চ শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, জেলা যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা জহিরুল ইসলাম পারভেজ ওরফে ক্যাঙারু পারভেজ, জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি রাজীব দাস, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সুজন, সালেহ রহমান সীমান্ত ও রিফাত বিন ওসমানসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৮-১০ জনের বিরুদ্ধে পুলিশ সুপারের কাছে সম্পূরক অভিযোগ জমা দেন।

পরে রফিউর রাব্বির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের নির্দেশে ওই বছরের ২০ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মামলাটি র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করে।

ত্বকী হত্যার কয়েকমাসের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ইউসুফ হোসেন লিটন, সুলতান শওকত ওরফে ভ্রমর, তায়েবউদ্দিন জ্যাকি, রিফাত বিন ওসমান ও সালেহ রহমান সীমান্ত। সবাই পরে জামিনে বেরিয়ে আসেন।

গ্রেপ্তার হওয়ার পর লিটন এবং ভ্রমর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা থেকে হত্যা পর্যন্ত সব ঘটনার বিবরণও দিয়েছিলেন।

ত্বকীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর কয়েক দিন আগে র‌্যাব জানিয়েছিল, তারা হত্যার রহস্য ভেদ করেছে এবং এমনকি একটি খসড়া তদন্ত প্রতিবেদনও তৈরি করেছে। ২০১৪ সালের মার্চে আজমেরী ওসমানসহ ১১ জনের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা র‌্যাবের খসড়া তদন্ত প্রতিবেদন গণমাধ্যমে ফাঁস হয়।

ত্বকীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর একদিন আগে, র‌্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান গণমাধ্যমে বলেছিলেন, তাদের কাছে ১১ জনের জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে এবং এই হত্যা মামলার অভিযোগপত্র যেকোন দিন আদালতে জমা দেওয়া হবে।

কীভাবে আজমেরী ওসমানের টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং নির্মম নির্যাতনেরও বর্ণনা তুলে ধরে র‌্যাব জানায়, হত্যার পর ত্বকীর মরদেহ আজমেরীর গাড়িতে ভরে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

কিন্তু এরপর ওই বছরের জুনে সংসদে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা 'ওসমান পরিবারের পাশে' থাকার ঘোষণা দিয়ে বক্তব্য রাখলে ত্বকী হত্যা মামলার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

ত্বকী হত্যাকাণ্ডের ১৩ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিচার দাবিতে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ ও নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট। আগামী ৬, ৮ ও ১৪ মার্চ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।

এত বছর পেরিয়েও ন্যায়বিচার না পাওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে ত্বকীর পরিবার এবং সচেতন মহলের মধ্যে। তারা বলছেন, দ্রুত তদন্ত শেষ করে এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচারকাজ শুরু করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করে বিবৃতিও দিয়েছেন দেশের ২৪ বিশিষ্ট নাগরিক।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়