কুলা-হাঁড়ি ও তালপাখায় মাতৃত্বের গল্প, আমলাপাড়ায় ১৪৪ বছরের দুর্গোৎসব
কুলা, চাটাই, তালপাখা, মাটির সরা, হাঁড়ি আর কড়ি দিয়ে সাজানো মণ্ডপ। প্রবেশপথ থেকে প্রতিমার বেদি সবখানে গ্রামবাংলার পরিচিত অনুষঙ্গ। এসব লোকজ উপকরণে নারায়ণগঞ্জের আমলাপাড়া সার্বজনীন পূজামণ্ডপে এবার ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মাতৃত্ব, মায়ের ত্যাগ ও ভালোবাসার গল্প।
আয়োজকদের ভাষ্য, ১৪৪ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই দুর্গোৎসবে এবারের মণ্ডপসজ্জার প্রতিপাদ্য ‘মা’। দেবী দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি সন্তানকে জন্ম দেওয়া, মমতায় বড় করে তোলা এবং জীবনের প্রতিটি ধাপে আগলে রাখার মধ্য দিয়ে একজন মায়ের অবদান তুলে ধরা হয়েছে।

মণ্ডপের দেয়াল ও সাজসজ্জার বিভিন্ন অংশে রয়েছে মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, তাঁদের উপদেশ মেনে চলা ও ভালোবাসার বার্তা। আয়োজকেরা জানান, মাতৃত্বের মহিমা ও মানুষের জীবনে মায়ের অবদান নতুন করে উপলব্ধি করতেই এ ভাবনা বেছে নেওয়া হয়েছে।
মণ্ডপসজ্জায় সময় লেগেছে প্রায় তিন মাস। প্রথম দুই মাস খোলা মাঠে বিভিন্ন উপকরণ তৈরি ও সাজানোর কাজ চলে। শেষ এক মাস পূজামণ্ডপে দিনরাত কাজ করে সাজসজ্জা সম্পন্ন করা হয়।

মণ্ডপ দেখতে আসা শ্রাবণী দাশ বলেন, প্রতিবছরই আমলাপাড়ায় সুন্দরভাবে থিম ফুটিয়ে তোলা হয়। এবার মাকে গুরুত্ব দিয়ে মণ্ডপ সাজানোর বিষয়টি তাঁর ভালো লেগেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা অবন্তী সাহা গত দুই বছর ধরে এখানে পূজা দেখতে আসছেন। এবারের সাজসজ্জা ও মাতৃত্বের ভাবনা তাঁরও ভালো লেগেছে। বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আরও বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরে দেখার ইচ্ছা রয়েছে বলে জানান তিনি।
আমলাপাড়া সার্বজনীন পূজা উদ্যাপন কমিটির কোষাধ্যক্ষ সানি সাহা বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর নতুন কিছু উপস্থাপনের চেষ্টা করি। এবারও সেই চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আশা করছি, আনন্দঘন পরিবেশে পুরো পূজা উদ্যাপন করতে পারব।’
উৎসবের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। সানি সাহা বলেন, ‘আমাদের শহর সম্প্রীতির শহর। আমাদের মণ্ডপের পাশেই একটি মসজিদ ও মাদ্রাসা রয়েছে। পাশাপাশি অবস্থান করেই আমরা বছরের পর বছর দুর্গাপূজা উদ্যাপন করছি। পূজার সময় তাঁরাও আমাদের সহযোগিতা করেন। আমরাও নামাজের সময়ে বাদ্যযন্ত্র বাজানো বন্ধ রাখি, যাতে তাঁরা নির্বিঘ্নে নামাজ আদায় করতে পারেন।’

নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি জানান, মণ্ডপ ও আশপাশের এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় রাখা হয়েছে। পুলিশ ও আনসার সদস্যদের পাশাপাশি আয়োজকদের প্রায় ১৫০ জন স্বেচ্ছাসেবী দায়িত্ব পালন করছেন।
আমলাপাড়া পূজামণ্ডপ পরিচালনা কমিটির সভাপতি প্রবীর কুমার সাহা বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষেরা এখানে দুর্গাপূজার প্রচলন করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় ১৪৪ বছর ধরে পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পাশাপাশি প্রতিবছর বিশেষ থিমের মাধ্যমে নতুন কিছু তুলে ধরার চেষ্টা করেন তাঁরা।
তিনি বলেন, ‘এবার মাতৃত্বের প্রতি সম্মান জানাতে আমরা “মা” থিম বেছে নিয়েছি। মায়ের ত্যাগ ও ভালোবাসার গল্প মণ্ডপে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।’
পূজার সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তায় স্থানীয় প্রশাসন সহযোগিতা করছে জানিয়ে সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রবীর কুমার সাহা।





































