১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ:

প্রকাশিত: ২২:২৫, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ওসমান পরিবারের দেলোয়ার ধানের শীষে, বিএনপিতে ক্ষোভ

ওসমান পরিবারের দেলোয়ার ধানের শীষে, বিএনপিতে ক্ষোভ

আওয়ামী লীগের আমলে বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া এলাকায় যে মানুষটি ছিলেন বিএনপি নেতা-কর্মীদের জন্য ত্রাসের নাম, সেই জাতীয় পার্টির নেতা দেলোয়ার হোসেন প্রধানই এখন চাইছেন ধানের শীষে ভোট। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হত্যা ও হামলার মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ‘ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী’ দেলোয়ারকে বিএনপির মাধ্যমে পুনর্বাসিত করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দলটির নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার নেতা-কর্মীরা। এমনকি তারা বলছেন, “ফ্যাসিস্টের সহযোগীকে” পুনর্বাসিত করে বরং ধানের শীষের ভোট কমছে। ভোটের মাঠে যা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে সুবিধা দেবে।

গত সোমবার রাতে কলাগাছিয়া ইউনিয়ন এলাকায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালামের পক্ষে প্রচারণায় ছিলেন এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন প্রধান। প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সদস্য সেলিম ওসমানের ‘মাই ম্যান’ খ্যাত এই নেতা আসনটিতে ধানের শীষের পক্ষে ভোটও চেয়েছেন। একই উঠান বৈঠকে তিনি জুলাই আন্দোলনকে ‘অরাজকতা’ বলেও আখ্যায়িত করেছেন। এতে জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ছাত্র-জনতাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

দেলোয়ার হোসেন প্রধান জেলা জাতীয় পার্টির সহসভাপতি। তিনি ছিলেন ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে অন্যতম। ওসমান পরিবারের আশীর্বাদে একাধিকবার বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিতও হয়েছেন। এমনকি গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারাতেও শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সরাসরি সহযোগিতা পেয়েছিলেন দেলোয়ার। ওসমান পরিবারের এই ‘দাক্ষিণ্যের’ বিপরীতে সবসময় তাদের সার্ভিস দিয়ে গেছেন দেলোয়ার।

২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বন্দরে এক অনুষ্ঠানে বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জাতীয় পার্টির নেতা দেলোয়ার হোসেন প্রধান প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, “আমি কোনো পার্টি বুঝি না। আমি বুঝি কেবল ওসমান পরিবার। আমি ওসমান পরিবারের সৈনিক।”

স্থানীয়রা বলছেন, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে একেএম সেলিম ওসমানের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন, যাদের তিনি ‘মাই ম্যান’ বলে সম্বোধন করতেন। এই তালিকার অন্যতম ছিলেন দেলোয়ার প্রধান। স্থানীয়দের অভিযোগ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা একাধিক মামলায় তিনি আসামি। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাবাসের পর হাইকোর্ট থেকে জামিনে মুক্ত হন তিনি।

বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা জানান, কলাগাছিয়া ইউনিয়নে বিএনপি নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের কাছে ‘ত্রাসের’ নাম ছিল দেলোয়ার হোসেন প্রধান। বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের সময় বাড়ি বাড়ি গিয়ে সার্চ করা, পুলিশকে তথ্য দিয়ে গ্রেপ্তার করানোর সমন্বয় করেছেন তিনি। কলাগাছিয়া ইউনিয়নের নিশং, চুনাভুরা, বুরুন্দি ও আলীনগর এলাকার মানুষজন দেলোয়ারের কারণে ব্যাপক নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। দেলোয়ার বিএনপির অন্তত দেড় থেকে দুইশ’ কর্মী-সমর্থককে গ্রেপ্তারের করানোর পেছনের কারিগর ছিলেন বলেও অভিযোগ স্থানীয় বিএনপি নেতাদের।

তারা বলছেন, ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিএনপি। ওই সময় নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী ছিলেন নাগরিক ঐক্যের প্রয়াত নেতা ও সংসদ সদস্য এসএম আকরাম। একই আসনে আওয়ামী লীগ জোটের প্রার্থী ছিলেন একেএম সেলিম ওসমান। পুরো নির্বাচনে সেলিম ওসমানের পক্ষে প্রচারণায়ই শুধু ছিলেন না, বিএনপি ও সমমনা দলের নেতা-কর্মীদের হুমকি-ধমকি ও গ্রেপ্তারের করানোর দায়িত্বেও ছিলেন দেলোয়ার হোসেন প্রধান।

ওই নির্বাচনে বিএনপি জোট প্রার্থী এসএম আকরামের পক্ষে কাজ করায় একরাতে কলাগাছিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম, মহানগর মৎস্যজীবী দলের সাবেক সদস্য সচিব আমিনুল ইসলাম, যুবদল নেতা মোজাম্মেল হোসেন, বিএনপি নেতা সোহেলসহ অন্তত ১৩ জন বিএনপি নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের এ অভিযানে রাতভর পুলিশের সঙ্গে ছিলেন দেলোয়ার প্রধানের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মনির।

বিএনপি নেতাদের অভিযোগ ছিল, ওই রাতে দেলোয়ারের নির্দেশে তার পিএস মনির বিএনপি নেতা-কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের ধরিয়ে দিয়েছেন।

এ নিয়ে কথা হলে কলাগাছিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, “ওই সময় আমরা সবাই এসএম আকরামের পক্ষে কাজ করছিলাম। যেহেতু তিনি জোটের প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু এই কাজ করায় আমাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশ নিয়ে গ্রেপ্তার করিয়েছিল দেলোয়ার প্রধান। তার লোকজন সরাসরি পুলিশকে সাথে নিয়ে আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল। আমি নিজেও গ্রেপ্তার হয়েছিলাম।”

“এখন সেই ব্যক্তিকে নিয়েই ধানের শীষের প্রচারণা চালাতে হচ্ছে। এইটা আমাদের জন্য অনেক কষ্টের এবং দুঃখের। কিন্তু আমরা অনেক কিছু বলতে পারি না। এই কষ্ট নিয়েই আমাদের থাকতে হচ্ছে”, যোগ করেন নির্যাতনের শিকার এই বিএনপি নেতা।

বিএনপির উপর জুলুম নির্যাতন চালানো নেতাকে দলের পক্ষে টেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে স্থানীয়ভাবে নেতিবাচক বার্তা যাবে। এতে কলাগাছিয়ার নিশং, চুনাভুরা, বুরুন্দি ও আলীনগর এলাকায় ধানের শীষের ভোট কমতে পারে বলেও আশঙ্কা বিএনপি নেতাদের।

শুধু বিএনপি নেতা-কর্মীদের নিপীড়ন, নির্যাতনই নয়, স্থানীয় মানুষজনের জমি দখল, বিরোধীতা করলে মামলা দিয়ে হয়রানির ঘটনাতেও দেলোয়ার হোসেন প্রধান সিদ্ধহস্ত ছিলেন বলে অভিযোগ কলাগাছিয়ার বাসিন্দাদের। তার লোকজন মাদক ব্যবসা ও কিশোর গ্যাং-এর নেতৃত্বেও আছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনেও তার অনুসারীরা ছাত্র-জনতার উপর সরাসরি হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জুলাই-যোদ্ধাদের অনেকে। তারা এ অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তুলে ধরেছেন।

গণমাধ্যমে ধানের শীষের পক্ষে দেলোয়ার প্রধানের প্রচারণার বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর এ নিয়ে অনেকেই ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন অনেকে। বুরুন্দি এলাকার আব্দুর রহিম নামে এক ব্যক্তি লিখেছেন, “যেসব (গালি) লোকজন দেলোয়ারের সাথে হাত মিলালি, আমার যৌবন ফিরিয়ে দে। দেলোয়ারের পুলিশি নির্যাতনের ভয়ে বউ ছেলেদের মুখতা দেখতে বাড়িতেই যেতাম না। আমি পনেরো বছর কুকুরের মতো পালিয়ে বেরিয়েছি এই দেলোয়ারের জন্য। ভয়ে বাড়ি যেতাম না। সমস্ত বিএনপিকে নজরে রাখতো এই দেলোয়ার। সেই দেলোয়ার এখন বিএনপির।”

ফলে, আওয়ামী লীগ ও ওসমান পরিবারের অন্যতম সহযোগী দেলোয়ার হোসেন প্রধানের বিএনপির পক্ষে ভোট চাওয়া কেবল বিএনপি নেতাদের মধ্যে নয় স্থানীয় ভোটারদের মধ্যেও আলোচনা তৈরি হয়েছে। যা বিএনপিকে কলাগাছিয়া ইউনিয়নের নিশং, চুনাভুরা, বুরুন্দি ও আলীনগর এলাকায় খানিকা দুর্বল করলো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়