নারায়ণগঞ্জ
বিদ্রোহ-বহিষ্কার-বিভক্তিতে টালমাটাল বিএনপি
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতি এখন গভীর সংকটে। দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া, ধারাবাহিকতায় একের পর এক বহিষ্কার, কমিটি স্থগিত এবং দীর্ঘদিনের গ্রুপিং রাজনীতির প্রকাশ্য রূপ সংগঠনটিকে কার্যত টালমাটাল অবস্থায় ফেলেছে। এতে মাঠের রাজনীতির পাশাপাশি ভোটের সমীকরণ যেমন জটিল হয়ে উঠছে, তেমনি প্রশ্ন উঠছে, এই পরিস্থিতি বিএনপি কীভাবে সামাল দেবে।
গত নভেম্বর মাসে প্রথম দফায় চারটি আসনে প্রার্থী দেয় জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি। অপর আসনটি জোটের শরিক দলকে ছেড়ে দেয়। প্রার্থী তালিকা চূড়ান্তের আগ পর্যন্ত মনোনয়ন প্রত্যাশীদের কর্মকাণ্ড সহ্য করলেও পরে তাকে প্রশ্রয় দেয়নি দলটি। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় একাধিক প্রভাবশালী নেতাকে বহিষ্কার করে বিএনপি। তারপরও তারা প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করে বিদ্রোহী হওয়ায় বিদ্রোহীদের যারা সহযোগিতা করছেন তাদেরও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে দল।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে দল জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীকে ছেড়ে দিলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. শাহ আলম। তাদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পরদিনই তাদের বহিষ্কার করে বিএনপি।
গত ২১ জানুয়ারি রাতে বহিষ্কার হন সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম, সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুর এবং মো. দুলাল। রেজাউল করিম ছিলেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, আর আতাউর রহমান আঙ্গুর ও দুলাল হোসেন ছিলেন জেলা বিএনপির সদস্য। তারা তিনজনই দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র হয়েছেন।
বিদ্রোহীদের শায়েস্তা এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের থামাতে এ ধরনের বহিষ্কারের আদেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানাচ্ছেন বিএনপির স্থানীয় নেতারা। বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করলে ওই নেতারাও বহিষ্কার হবেন বলেও হাইকমাণ্ড হুঁশিয়ার করেছে।
তবে, বিএনপি এই ধরনের বহিষ্কার শৃঙ্খলা রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও স্থানীয় পর্যায়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। বহিষ্কৃত নেতাদের অনেকেই নিজ নিজ এলাকায় সামাজিক ও সাংগঠনিক প্রভাব ধরে রেখেছেন। যে কারণে বহিষ্কারের পরেও তাদের সাথে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। দলের হুঁশিয়ারির তোয়াক্কা করছেন না তারা।
এর প্রমাণ মিলেছে ২১ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রতীক বরাদ্দের সময়ও। দলীয় প্রার্থীদের সঙ্গে যেমন বিএনপি নেতা-কর্মীরা ছিলেন, তেমনি বিদ্রোহীদের সঙ্গেও ছিলেন একাংশের নেতা-কর্মীরা। যাদের অনেকেই স্থানীয়ভাবে বেশ প্রভাবশালী।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থী। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন ছাড়া বাকি চারটিতেই বিদ্রোহীদের মুখোমুখি হতে হবে বিএনপি ও জোটের প্রার্থীদের। অন্তত দু’টি আসনে দুইজন বিদ্রোহী প্রার্থী লড়ছেন। প্রভাবশালী এই নেতাদের মোকাবেলা করে বিজয় পাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়াবে দল মনোনীত প্রার্থীদের জন্য।
উদাহরণ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটিকেই বিবেচনা করা যেতে পারে। ফতুল্লার পাঁচটি ইউনিয়ন ও সদরের দু’টি; এ সাত ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত আসনটিতে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীকে সামাল দিতে হচ্ছে গিয়াস উদ্দিন ও শাহ্ আলমের মতো প্রভাবশালী দুই বিএনপি নেতাকে।
এই দুই বিদ্রোহীর মধ্যে গিয়াস আসনটির সাবেক সংসদ সদস্য। ২০০১ সালে ধানের শীষ প্রতীকে আসনটি থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও সাংগঠনিক ভিত্তির কারণে এখনো এলাকায় তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন।
অন্যদিকে শিল্পপতি মো. শাহ আলম বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে অংশ নিয়ে মাত্র আড়াই হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। ওই নির্বাচনী অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে এখনো তার নিজস্ব ভোট-ব্যাংক সক্রিয় রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম। তিনি টানা চারবার বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচন করে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দীর্ঘ সময় এমপি থাকার কারণে সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় তার শক্তিশালী কর্মী-সমর্থক ও ভোটার-ভিত্তি রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন গিয়াস উদ্দিন। ফলে, এ আসনে আজহারুল ইসলাম মান্নানকে রেজাউলের পাশাপাশি গিয়াসকেও সামাল দিতে হবে। অন্তত বিজয় পেতে হলে।
নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনে একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী আতাউর রহমান আঙ্গুর। তিনি পরপর তিনবার বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচন করে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আড়াইহাজারের রাজনৈতিক অঙ্গনে তার পারিবারিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব এখনো সক্রিয়।
তাছাড়া, তার ভাতিজা মাহমুদুর রহমান, যিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় সহঅর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদকেরও সহযোগিতা পাবার সম্ভবনা রয়েছে আঙ্গুরের। অন্যদিকে, মনোনয়ন-বঞ্চিত মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক পারভীন আক্তারকে পেতে পারেন পাশে।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ। তিনি দলটির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক।
নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. দুলাল। তিনিও নির্বাচনি মাঠ ছেড়ে যাবেন না বলে পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন। ছাত্রদলের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা দুলালও আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপুর গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির এই বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে দলের ঐতিহ্যগত ভোট-ব্যাংক মারাত্মকভাবে বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রকাশ্যে ঐক্যের কথা বলা হলেও বাস্তবে তৃণমূলের কর্মীরা বিভ্রান্ত। দলীয় প্রার্থী নাকি বিদ্রোহী কাকে সমর্থন দিবেন এ নিয়ে দোটানায় আছেন মাঠপর্যায়ের কর্মী-সমর্থকরা। কেননা, একেক নেতা একেকজনের পক্ষে কাজ করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জ বিএনপির বর্তমান সংকটের মূলেই রয়েছে অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং। দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তি ও বলয়কেন্দ্রিক রাজনীতিতে বিভক্ত দলটি নির্বাচনের মুখে এসে আরও স্পষ্টভাবে একাধিক গ্রুপে ভাগ হয়ে পড়েছে। মনোনয়নকে কেন্দ্র করে এই গ্রুপিং আরও তীব্র হয়েছে।
কেউ কেন্দ্রঘেঁষা অবস্থান নিতে চেষ্টা করছেন, আবার কেউ স্থানীয় প্রভাব, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও কর্মী-সমর্থকের ওপর ভর করে আলাদা শক্ত অবস্থান গড়ে তুলছেন। অভিযোগ রয়েছে, মনোনয়ন-বঞ্চিত নেতাদের অনুসারীদেরও সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। এতেও দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে অনেকটা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন তারা।
এই গ্রুপিং রাজনীতিরই অংশ হিসেবে ২২ জানুয়ারি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির বিদ্যমান কমিটি স্থগিত করে কেন্দ্র। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই কমিটি স্থগিত থাকবে। দলীয় সূত্র জানায়, স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই অভ্যন্তরীণ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়বে নির্বাচনী সমীকরণে। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জে বহিষ্কার, বিদ্রোহী প্রার্থী ও গ্রুপিংয়ের কারণে ভোট একত্রিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে দশ দলীয় জোট ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি এই বিভক্তিকে নিজেদের রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছে।
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন দ্রুত সাংগঠনিক ঐক্য পুনর্গঠন। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে- এবার নারায়ণগঞ্জে বিএনপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লড়াই প্রতিপক্ষের সঙ্গে নয়, বরং নিজেদের ভেতরের বিভাজন কাটিয়ে এক থাকার সংগ্রাম, বলছেন দলটির দায়িত্বশীল নেতারা।





































