প্রশ্নবানের মুখে প্রশাসক, ‘সেবা ও সমাধান’ চান নগরবাসী

নতুন অর্থবছরের জন্য নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের বাজেট ঘোষণার পর মুক্ত আলোচনায় শহরের নানাবিধ সমস্যার কথা প্রশাসকের সামনে তুলে ধরেছেন নগরবাসী। বিশেষ করে সুপেয় পানির সংকট, যানজট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমস্যার সমাধানও চেয়েছেন তারা।
বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) সকাল ১১টায় শহরের নিতাইগঞ্জ এলাকায় নগরভবন মিলনায়তনে বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠান শুরু হয়। শুরুতে প্রশাসক এএইচএম কামরুজ্জামান ৭৭৫ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন। এ বাজেটে এবার নতুন করে কোনো কর যুক্ত করা হয়নি বলেও জানান তিনি।
নগর পরিকল্পনাবিদ মঈনুল ইসলামের সঞ্চালনায় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন নাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল আজিজ।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট এবি সিদ্দিক, জামায়াতে ইসলামীর মহানগরের সাবেক আমীর মাওলানা মাঈনুদ্দিন আহমাদ, বর্তমান আমীর আব্দুল জব্বার, গণসংহতি আন্দোলনের জেলা সমন্বায়ক তরিকুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন মহানগর সভাপতি মুফতি মাসুম বিল্লাহ, সাবেক কাউন্সিলর ও বাসদ নেতা আসিত বরণ বিশ্বাস, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মনি সুপান্থ, আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী সভাপতি নূরউদ্দিন আহমেদ, মহিলা পরিষদ জেলা সভাপতি রিনা আহম্মেদ প্রমুখ।
বাজেট ঘোষণার পর উন্মুক্ত আলোচনায় নগরবাসী শহরের পানির সংকট, সড়কে যানজট, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ডেঙ্গুর প্রকোপ ও বহুল আকাঙ্খিত কদমরসুল সেতু প্রকল্প নিয়ে কথা বলেন।
প্রশ্নবান ও অভিযোগের সামনে পড়তে হয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে সদ্য বদলির আদেশ হওয়া নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) এএইচএম কামরুজ্জামানকে। এ সময় এই প্রশাসককে ‘সৎ ও কর্মঠ’ উল্লেখ করে অনেকে তার বদলির আদেশ প্রত্যাহারেরও দাবি জানান।
তবে, সিটি কর্পোরেশনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে উপস্থিতি ‘গড়হাজির’ বলে অভিযোগ করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুস সালাম।
তার ভাষ্য, “কোনো সমস্যায় নাসিকের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। বর্ষাকালে ড্রেনের কাজ শুরু করে গত ৭ মাসে ধরে শায়েস্ত খাঁ, সিরাজদৌল্লাহ রোড বন্ধ। আজকে ঘোষিত বাজেট বইও আগের বইয়ের ফটোকপি। সাবেক মেয়রের সময় সিদ্ধান্ত হয়েছিল তিনভাগের একভাগ মিশুক লাইসেন্স দেয়া হবে। কিন্তু ৫ আগস্টের পর ১৭ হাজার মিশুককে লাইসেন্স দিয়ে দেয়া হলো। পূর্ব থেকে ২০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে বাজেট ঘোষণা করেছে কিন্তু এ বাজেট দিয়ে লাভ কি! আমরা চাই সেবা কিন্তু তাতে নাসিক ব্যর্থ।”
এদিকে, ঘোষিত বাজেটকে স্বাগত জানালেও তা বাস্তবায়নে সমান উদ্যোগ নেওয়ার প্রতি তাগিদ দেন গণসংহতি আন্দোলনের নেতা তরিকুল সুজন। তিনি বলেন, “নিঃসন্দেহে এ বাজেট ভালো। কিন্তু প্রচলিত প্রবাদে আছে- ‘কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই’। অর্থাৎ এসব বাজেট পাশ হয় কিন্তু কাজ হয় না। নাসিক স্বচ্ছতার কথা বললেও জবাবদিহিতার কথা বলে না। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য নাসিক দৃশ্যমান কোনো কাজ করছে বলে আমরা দেখি না।”
এ প্রসঙ্গে তিনি গত মে মাসে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে ঢুকে ব্যাটারিচালিত বড় অটোরিকশা চালকদের হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় নাসিক কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি বলেও উল্লেখ করেন।
ঘোষিত বাজেটে সংস্কৃতি অঙ্গণের উন্নয়নের জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দা রাখা হয়নি উল্লেখ করে সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মনি সুপান্থ বলেন, “নারায়ণগঞ্জে সাংষ্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আমরা শহীদ মিনারকে ব্যবহার করি। কারণ চুনকা মিলনাতয়নের ভাড়া অনেক বেশি। কিন্তু সেই শহীদ মিনার খুবই অরক্ষিত, পর্যাপ্ত লাইট নেই। এই সমস্যার সমাধান দ্রæত করা উচিত।”
সাবেক কাউন্সিলর অসিত বরণ বিশ্বাস বলেন, “কদমরসুল ব্রিজের শহরের অবতরণ পয়েন্ট ব্যস্ততম এক নম্বর রেলগেট। এরই মধ্যে নাসিক চেম্বার রোডের ১৪ ফুট জায়গা রেলকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় সেতু হলে গাড়ি আর সেতু থেকে নামতে পারবে না। তাই ব্রিজের নকশা পরিবর্তন প্রয়োজন। ব্রিজের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে, কিছু না করলে এই নকশাতেই শেষ হয়ে যাবে। তখন এটা আমাদের জন্য একটা জঞ্জাল ছাড়া কিছু হবে না।”
তবে, এ সেতুর প্রয়োজনীতার কথা তুলে ধরে তিনি সেতু প্রকল্প বাতিল নয়, নকশা পরিবর্তনের দাবি জানান।
শহরে ড্রেন নির্মাণে ধীরগতির কথা জানিয়ে নূরউদ্দিন আহমেদ বলেন, “ড্রনের নির্মাণ কাজের জন্য দিনের পর দিন, মাসের পর মাস রাস্তা খুড়ে, নির্মাণ সামগ্রী রেখেছে। এখন আবার ফুটপাতের নির্মাণের জন্য গর্ত করে রেখে দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারে না, এভাবে কতদিন চলতে পারে। মীর জুমলা সড়ক উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এখন পুরো সড়কই দখল করে আছে ব্যবসায়ীরা। এমন অবস্থায় শহরের যানজট কিভাবে কমবে।”
এবি সিদ্দিক বলেন, “বন্দরের শাহী মসজিদ, কদমরসুল ও সোনাকান্দা কেল্লা সংস্কারের কথা ছিল কিন্তু এতগুলো বছরেও কোনো কাজ হয়নি। আজ বাজেটে অনেককিছুর কথা বলা হয়েছে কিন্তু এগুলো যে বাস্তবায়ন হবে তার নিশ্চয়তা দেয়া হয়নি। কোটি টাকা খরচ করে মীরজুমলা সড়ক করা হয়েছি আর সেই সড়ক পানিতে ভিজিয়ে, ময়লা ফেলে নষ্ট করে ফেলছে।”
প্রশাসকের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আপনি আমাদের সাথে একমত হয়েছিলেন শহরের যানজটের মূলে অটোরিকশা। বলেছিলেন, অটোর লাইসেন্স দিবেন না। কিন্তু আপনি কথা না রেখে লাইসেন্স দিলেন। দয়া করে যাওয়ার আগে কিছু কাজ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যান।”
সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী এলাকার শ্রমিকদের সুচিকিৎসার জন্য আলাদা হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দাবি জানান জামায়াত নেতা আবদুল জব্বার।
সংস্কৃতি কর্মী ফারুক মোহসীন বলেন, “আমাদের শিশুদের আমরাই পঙ্গু বানাচ্ছি। ওদের খেলার জায়গা নেই। এক নম্বর বাবুরাইলের মাঠটিকে পূর্ণাঙ্গ খেলার মাঠে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। অনুরোধ করবো, মাঠটি সংস্কার করে শিশুদের জন্য উন্মুক্ত করার জন্য।”
সুপেয় পানির সরবরাহ নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে সাংবাদিক লতিফ রানা বলেন, “বন্দরবাসী মাত্র দুটি গভীর পাম্পের পানির উপর নির্ভর করে। অধিকাংশ সময় পাম্পগুলো নষ্ট থাকে এবং সম্প্রতি পাম্পের সরঞ্জাম চুরির কারণে পাম্প বন্ধ। যার কারণে মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।”
ব্যবসায়ী হারুণ অর রশীদ বলেন, “আমরা জন্ম থেকে জ্বলছি। ঘর থেকে বের হতে পারি না, অটো আর হকার। সড়কগুলোর বেহাল অবস্থা। আপনি চলে যাবেন, যাওয়ার আগে এগুলোর সমাধান করে দিয়ে যান। নগরবাসীর টাকায় এ প্রতিষ্ঠান কিন্তু আমরা সেবা পাই না।’
নাসিক প্রশাসক এএইচএম কামরুজ্জামান বলেন, ‘ওয়াসার পানির পাইপগুলো দীর্ঘদিনের পুরনো। ফলে এখন যেখানেই পাইপ উন্মুক্ত হচ্ছে সেখানেই পাইপ ফেটে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।’
কদমরসুল ব্রিজের নকশায় পরিবর্তন আনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কদমরসুল ব্রিজ একনেকে অনুমোদিত। একনেকে অনুমোদিত প্রকল্প পরিবর্তন কঠিন। তবু আমাদের চেষ্টা থাকবে ডিজাইনে পরিবর্তন আনার। আমরা মানুষের চাহিদা কথা তুলে ধরবো।
মিশুক অনুমোদন বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন করে আমরা কোনো লাইসেন্স দেয়নি। সিটির তিন জোনে আমাদের ১৭ হাজার ৬০০ রিকশা ছিল। যা এতোদিন নবায়ন করা হয়নি, আমরা নবায়নের উদ্যোগ নেই। সাড়ে ১৭ হাজারের মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন করেছে ৯ হাজারের মত। অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধে আমাদের ৪৩জন যানজট নিরসনকর্মী নিয়োগ করেছি এবং বিকেএমইএ, চেম্বার অব কমার্স ও ট্রাফিক পুলিশের সহায়তায় আমরা চেষ্টা করছি। এটা এত বেশি অনিয়ন্ত্রিকত ও সংখ্যায় এতবেশি কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।’
নাসিক প্রশাসক বলেন, ‘নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। শহরের ময়লা পরিষ্কারের সময় আছে। বেলা ১২টার পর ময়লা পরিষ্কার করা হয় না, পরেরদিন করা হয়। বেলা ১২টার পর নাগরিকরা ময়লা পেলে রাখে শহর নোংরা করে। নাগরিকদের দায়িত্ব আছে, তারা যদি দায়িত্ব পালন না করে তাহলে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে এত গুরুদায়িত্ব পালন করা সম্ভব না।’