১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ:

প্রকাশিত: ২০:৩২, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ২০:৩৩, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

নারায়ণগঞ্জ-৪ 

প্রতীক নয় ব্যক্তিই ফ্যাক্টর, সুবিধাজনক অবস্থানে মনির কাসেমী

প্রতীক নয় ব্যক্তিই ফ্যাক্টর, সুবিধাজনক অবস্থানে মনির কাসেমী

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শিল্প ও শ্রমিক অধ্যুষিত গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ-৪। প্রতি জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই বড় রাজনৈতিক দলগুলো এখানে তাদের প্রভাবশালী প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়ে থাকে। তবে এবারের নির্বাচনে আসনটির ব্যালটে ধানের শীষ কিংবা দাঁড়িপাল্লা—কোনো প্রতীকই থাকছে না। প্রধান দুই দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তাদের জোটের প্রার্থীদের জন্য আসনটি ছেড়ে দিয়েছে। ফলে আসন্ন নির্বাচনে প্রতীক নয়, বরং ব্যক্তিই হয়ে উঠেছেন প্রধান ফ্যাক্টর।

নতুন সীমানা অনুযায়ী সদর উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন—ফতুল্লা, কুতুবপুর, বক্তাবলী, কাশীপুর, এনায়েতনগর, গোগনগর ও আলীরটেক—নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৪ সংসদীয় আসন। এখানে মোট ভোটার ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩২৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৭০ হাজার ১৭ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৬৫ হাজার ৩০৪ জন এবং ৪ জন হিজড়া ভোটার রয়েছেন। আসনটির একটি বড় অংশের ভোটার ভাসমান জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, যারা জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় কর্মরত।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ ১৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। এর মধ্যে দুজন ইতোমধ্যে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে চূড়ান্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ১১ জন, যাদের অধিকাংশই প্রভাবশালী ও হেভিওয়েট প্রার্থী। তাদের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি অতীতে এই আসনের সংসদ সদস্যও ছিলেন।

জনসমর্থনের দৌড়ে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো এবারও দলটি আসনটি ছেড়ে দিয়েছে জোটের শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর জন্য। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করলেও এবার নিজ দলের প্রতীক খেজুর গাছ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব। একই সঙ্গে তিনি হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে রয়েছেন এবং সংগঠনটির নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ইসলামী ঘরানার রাজনীতিতে তার গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্য। ফলে পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে তার অবস্থান অন্যদের তুলনায় বেশ শক্তিশালী।

তবে আসনটিতে তাকে বিএনপিরই তিনজন প্রভাবশালী ও পরিচিত নেতার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে। বিষয়টি উপলব্ধি করেই তিনি কেবল নিজ দলীয় সমর্থনের ওপর নির্ভর না করে জোটের নেতাকর্মীদের নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। এমনকি ভোটারদের কাছে ‘খেজুর গাছই ধানের শীষ’—এই বার্তা দিয়েও ভোট চাইতে দেখা যাচ্ছে তাকে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও তার পক্ষে ভোট চেয়ে নেতাকর্মীদের কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতাও তার পক্ষে মাঠে নেমেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির এই সমর্থন তার প্রচারণাকে অনেকটাই কার্যকর করেছে এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে।

এই আসনে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক বিএনপি নেতা মোহাম্মদ শাহ আলম। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন এবং একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে ফতুল্লা অঞ্চলে তার প্রভাব ব্যাপক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দলীয় অনেক নেতা-কর্মীর পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। ফলে তাদের একটি বড় অংশ এখন তার পক্ষে কাজ করছে, যার কারণে সম্প্রতি কয়েকজন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। 

জোটের প্রার্থীর মতো শাহ আলমও নিজেকে বিএনপির প্রকৃত প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করছেন। প্রচারণায় তিনি ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ‘হরিণ প্রতীকই ধানের শীষ’। এতে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ায় তার বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে মামলা হয়েছে।

প্রায় একই ধরনের বক্তব্য দিতে দেখা গেছে ইসলামপন্থি ও সমমনা দশ দলীয় জোটের প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিনকেও। বিভিন্ন সময় তিনি বলেছেন, ‘শাপলা কলিই দাঁড়িপাল্লা’। দীর্ঘ বিরতির পর জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে অংশ নিলেও তারা এই আসনটি ছেড়ে দিয়েছে জোটের শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জন্য। আব্দুল্লাহ আল আমিন গণঅভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা তরুণ নেতৃত্বের অন্যতম মুখ এবং এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক।

গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উঠে আসা এই প্রার্থীর প্রতি তরুণ ভোটারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয়তা রয়েছে। পাশাপাশি জোটের প্রার্থী হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীসহ শরিক দলগুলো সক্রিয়ভাবে তার প্রচারণায় যুক্ত রয়েছে। আব্দুল্লাহ আল আমিন একসময় ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, ফলে জামায়াতের কাছ থেকেও তিনি বাড়তি সহায়তা পাচ্ছেন বলে মনে করছেন অনেকে। রবিবার জোটের আরেক প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আনোয়ার হোসেন তাকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, যা তার অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে।

এ ছাড়া নির্বাচনী দৌড়ে রয়েছেন সাবেক বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন এবং মোহাম্মদ আলী। গিয়াস উদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে এবং নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ‘কিং মেকার’ হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ আলী বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির হাতি প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা দুজনই প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হলেও প্রচারণায় বিএনপির নাম ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে।

ফতুল্লা অঞ্চলে গিয়াস উদ্দিনের আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ২০০১ সালে তিনি বিএনপির মনোনয়নেই এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। যদিও একসময় তিনি কৃষক লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তবুও তার অনুসারীদের বড় একটি অংশ বিএনপির কর্মী।

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে মোহাম্মদ আলীর নাম সমীহের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তার ব্যক্তিত্ব ও কৌশলী রাজনৈতিক ভূমিকা তাকে ‘কিং মেকার’ হিসেবে পরিচিত করেছে। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডের আহ্বায়ক। তরুণদের তুলনায় প্রবীণ রাজনীতিক ও কর্মীদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা বেশি। যদিও তার বিরুদ্ধে প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও রয়েছে।

এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুফতি ইসমাইল কাউসার হাতপাখা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দলটির একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক রয়েছে এবং প্রচারণার মাধ্যমে তিনিও ভালো সাড়া পাচ্ছেন।

এ ছাড়া বাসদের সেলিম মাহমুদ (মই), জাসদের মো. সুলাইমান দেওয়ান (মোটরগাড়ি), সিপিবির ইকবাল হোসেন (কাস্তে), গণঅধিকার পরিষদের আরিফ ভূঁইয়া (ট্রাক) এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির সেলিম আহমেদ (একতারা) প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। তবে তাদের দলীয় শক্তি ও প্রচারণা তুলনামূলকভাবে সীমিত।

এদিকে রবিবার ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী সালাউদ্দিন খোকা মোল্লা (লাঙ্গল)। যদিও প্রচারণার মাঠে তার উল্লেখযোগ্য তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়