নারায়ণগঞ্জ
নির্বাচন ঘিরে বাড়ছে সহিংসতা: শঙ্কায় ভোটাররা
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। প্রার্থীদের সভা-সমাবেশ ও কৌশলী প্রচারণার পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হুমকির ঘটনা নির্বাচনী পরিবেশকে উদ্বেগজনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা, হত্যার হুমকি, অস্ত্রসহ সন্দেহভাজন ব্যক্তি আটক এবং ফোনে হুমকির মতো ঘটনা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
গত কয়েক দিনের ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি প্রবণতায় রূপ নিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে নির্বাচনী মাঠ সংঘাতমুখী হয়ে উঠতে পারে, যা শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের জন্য বড় হুমকি।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে গত ১৪ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিন দেওভোগ এলাকায় গণসংযোগ চালানোর সময় এক তরুণকে সন্দেহজনক মনে হলে তাকে আটক করা হয়। পরে তার পোশাকের ভেতর থেকে একটি চাপাতি উদ্ধার করা হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আল আমিন নিরাপদে স্থান ত্যাগ করেন। পরে অভিযুক্তকে র্যাব গ্রেপ্তার করে।
নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন ইসলামিক ও সমমনা ১০ দলীয় জোট মনোনীত খেলাফত মজলিসের নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের প্রার্থী এবিএম সিরাজুল মামুন। তিনি সংবাদ সম্মেলনে জানান, টেলিফোনে একাধিক হুমকি পেয়েছেন।
এর আগে গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর বিএনপি মনোনীত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদ নিরাপত্তাজনিত শঙ্কার কথা উল্লেখ করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।
১৮ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেনের কর্মী শাহীন আহমেদ পরাগ (৩৮) সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। বন্দরের নবীগঞ্জ কবিলের মোড় এলাকায় মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার সময় তিনি হামলার মুখে পড়েন। অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা তাকে গুলি করার হুমকি দেয়। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরাগ দাবি করেন, রাজনৈতিক কারণে দীর্ঘদিন ধরেই তাকে লক্ষ্য করা হচ্ছিল এবং হামলার সঙ্গে বিএনপির প্রার্থী আবুল কালামের কর্মীরা জড়িত।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদের বিরুদ্ধে সাবেক ছাত্রদল নেতা আবু হানিফ রাসেলকে ফোনে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা ভোটারদের মধ্যে ভয় ও অনাস্থা তৈরি করছে, যার প্রভাব পড়তে পারে ভোটার উপস্থিতির ওপর। বিশেষ করে শিল্পঘন ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল নারায়ণগঞ্জে সহিংসতার ধারাবাহিকতা সাধারণ মানুষের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।
প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রার্থীদের নিরাপত্তা, গণসংযোগকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ এবং দলীয় কোন্দল থেকে উদ্ভূত সহিংসতা—সবকিছু একসঙ্গে সামাল দেওয়া প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এখনই যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থান না নেয়, তাহলে নারায়ণগঞ্জে নির্বাচনী সহিংসতা আরও বাড়তে পারে। এতে শুধু প্রার্থী ও কর্মী নয়, সাধারণ ভোটার এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও ঝুঁকির মুখে পড়বেন। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন এবং সব পক্ষের জন্য সমান আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।





































