০৫ জুন ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২১:৪৬, ৫ জুন ২০২৬

আপডেট: ২২:১৬, ৫ জুন ২০২৬

মরণ সাগর পাড়ে, তোমারেই স্মরি

শিশু সংগঠক রেখা গুণের স্মরণসভা

শিশু সংগঠক রেখা গুণের স্মরণসভা

নারায়ণগঞ্জের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ও শিশু আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক রেখা গুণের জীবন, কর্ম ও আদর্শকে স্মরণ করে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী নারায়ণগঞ্জ জেলা সংসদ, খেলাঘর নারায়ণগঞ্জ জেলা এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার যৌথ আয়োজনে এক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্মরণসভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিশু সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, কর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং পরিবারের সদস্যরা অংশ নিয়ে তাঁর কর্মময় জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন।

শুক্রবার বিকেল ৫টায় নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটের নিচতলায় অনুষ্ঠিত স্মরণসভার শুরুতেই প্রয়াত এই সংগঠকের প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পরে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী গান ‘আগুনের পরশমণি’ পরিবেশনের মাধ্যমে গুণী এই সংগঠককে স্মরণ করেন।

স্মরণসভায় শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রেখা গুণের পরিবারের সদস্যরা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, খেলাঘর, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, খেলাঘর নারায়ণগঞ্জ জেলা, খেলাঘর সোনারগাঁ ও রূপগঞ্জ উপজেলা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউট, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটি, সমমনা, উন্মেষ সাংস্কৃতিক সংসদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়ন, ক্রান্তি খেলাঘর আসর, সত্যাশ্রয়ী খেলাঘর আসর, রূপসী বাংলা খেলাঘর আসর, একতা খেলাঘর আসর, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট, খেলাঘর কুমিল্লা জেলা, অর্চনা একাডেমি, চারণ সাংস্কৃতিক সংসদ এবং প্রজাপতি খেলাঘর আসরসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

অনুষ্ঠানে প্রয়াত রেখা গুণের বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্ম তুলে ধরে জীবনী পাঠ করেন খেলাঘর নারায়ণগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক ফুয়াদ মহসিন।

স্মরণসভায় বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় খেলাঘরের প্রেসিডিয়াম সদস্য রথীন চক্রবর্তী, সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আজিজ, মহিলা পরিষদের নেত্রী লক্ষ্মী চক্রবর্তী, অমিতাভ চক্রবর্তী, খেলাঘর নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি জাহিদুল হক দিপু, ফারুক মহসিন, মনোয়ারা সুরুজ মনু, সিপিবির হাফিজুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মনি সুপান্থ, ভবানী শংকর রায়, উন্মেষের প্রদীপ ঘোষ বাবু এবং সুমিত রায়।

বক্তারা বলেন, রেখা গুণ ছিলেন শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং মানবিক সমাজ গঠনের আন্দোলনের একজন নিরলস কর্মী। নিজের ব্যক্তিগত জীবন ও শারীরিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে তিনি আমৃত্যু শিশু-কিশোরদের বিকাশ, সংস্কৃতি চর্চা এবং প্রগতিশীল সমাজ গঠনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। তাঁর মৃত্যু শুধু খেলাঘর পরিবারের নয়, পুরো নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

আলোচনায় উঠে আসে, ২০০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে নানা জটিল রোগের সঙ্গে সংগ্রাম করেছেন রেখা গুণ। কঠিন শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তাঁর মনোবল ছিল অসাধারণ। শিশুদের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলা, আনন্দময় শৈশব নিশ্চিত করা এবং শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০০১ সালে তিনি দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘর-এর সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর খেলাঘরের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেন।

একতা খেলাঘর আসরের মাধ্যমে কয়েক প্রজন্মের শিশু-কিশোরকে তিনি মাতৃস্নেহ, ভালোবাসা ও আদর্শিক শিক্ষায় গড়ে তুলেছেন। আমৃত্যু তিনি একতা খেলাঘর আসরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি খেলাঘর নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সহ-সভাপতি, উপদেষ্টা কমিটির সদস্য এবং কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের আজীবন সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন খেলাঘর নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি জহিরুল ইসলাম জহির। স্মরণসভায় গান পরিবেশন করেন রথীন চক্রবর্তী এবং আবৃত্তি করেন জিয়াউল ইসলাম কাজল। পরে ‘মরণ সাগর পাড়ে, তোমারে স্মরি’ গান পরিবেশনের মাধ্যমে প্রয়াত সংগঠকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

উল্লেখ্য, রেখা গুণ ১৯৫৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এক রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন কমরেড প্রাণগোবিন্দ গুণ এবং মা কমরেড বাণী গুণ। পারিবারিক আদর্শিক চর্চার ধারাবাহিকতায় তিনি সারাজীবন প্রগতিশীল, মানবিক ও গণমুখী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। উদারতা, সহনশীলতা, পরোপকারিতা এবং মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

২০০০ সালে তাঁর শরীরে বাসা বাঁধে দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সার। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় তিনি এই রোগের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যান। সর্বশেষ চলতি বছরের এপ্রিল মাসে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়ার পর তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। দীর্ঘ রোগভোগের পর গত ৩০ মে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মৃত্যুকালে তিনি চার ভাই, এক বোনসহ অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী, সহযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং তাঁর স্নেহধন্য শিশু-কিশোরদের রেখে গেছেন। কর্ম, আদর্শ ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে রেখা গুণ বেঁচে থাকবেন তাঁর প্রিয় মানুষদের হৃদয়ে এবং নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক-সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়