২৫ মার্চ ২০২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৪:৩৬, ২৫ মার্চ ২০২৬

স্মৃতি রক্ষার দাবি

নারায়ণগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের ২৮৮ গণহত্যা-নির্যাতন কেন্দ্র

নারায়ণগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের ২৮৮ গণহত্যা-নির্যাতন কেন্দ্র

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ জেলাজুড়ে সংঘটিত হয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস গণহত্যা, বধ্যভূমি ও নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা। তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব স্থানের অনেকই অরক্ষিত থাকায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই স্মৃতিগুলো।

গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রের প্রকাশিত তথ্যমতে, নারায়ণগঞ্জে মোট ২৮৮টি গণহত্যা, গণকবর, বধ্যভূমি ও নির্যাতন কেন্দ্র চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০৯টি গণহত্যা, ২৩টি বধ্যভূমি, ১০টি গণকবর এবং ৪৬টি নির্যাতন কেন্দ্র।

ইতিহাসবিদদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নারায়ণগঞ্জ ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট এলাকা। নদীবেষ্টিত এই অঞ্চলে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করে তারা পরিকল্পিতভাবে হত্যাযজ্ঞ চালায়।

১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বর বক্তাবলী অঞ্চলে সংঘটিত গণহত্যা জেলার অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। ওইদিন ভোরে পাকিস্তানি বাহিনী তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে বক্তাবলীর ২২টি গ্রাম। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের পর ভারী অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে তারা নির্বিচারে গ্রামবাসীদের হত্যা করে এবং পুরো এলাকা পুড়িয়ে দেয়। এ ঘটনায় অন্তত ১৩৯ জন নিহত হন।

এছাড়া ফতুল্লার পঞ্চবটি হরিহরপাড়া এলাকায় অবস্থিত তৎকালীন ন্যাশনাল অয়েল মিল ছিল একটি কুখ্যাত বধ্যভূমি ও নির্যাতন কেন্দ্র। এখানে সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে নির্যাতনের পর হত্যা করে লাশ বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। স্বাধীনতার পর মিলের ভেতরে নারীদের ওপর নির্যাতনের নানা আলামত পাওয়া যায়।

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়কের আলীগঞ্জ সরকারি পাথর ডিপোতেও চলত নিয়মিত হত্যাযজ্ঞ। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন স্থান থেকে ধরে আনা মানুষদের রাতের অন্ধকারে হত্যা করে লাশ গুম করা হতো। অনেক সময় পাথর বেঁধে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।

অন্যদিকে, আদমজী জুট মিল এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী গড়ে তোলে বড় ধরনের নির্যাতন কেন্দ্র। সেখানে শ্রমিকসহ অসংখ্য মানুষকে গুলি করে হত্যা করে কূপে ফেলে দেওয়া হতো। সিদ্ধিরগঞ্জ ও গোদনাইল এলাকার বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম ডিপোতেও ছিল গণকবর ও বধ্যভূমির অস্তিত্ব।

১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল বন্দরে সিরাজদৌল্লাহ ক্লাব মাঠে ৫৪ জন নারী-পুরুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। পরে লাশগুলো পুড়িয়ে ফেলে পাকিস্তানি বাহিনী।

এছাড়া শহরের নিতাইগঞ্জ, বিআইডব্লিউটিএ জেটি, আড়াইহাজার ও সোনারগাঁসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে গণহত্যা ও নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা।

তবে এসব স্থানের অনেকগুলোই এখনো অরক্ষিত। কোথাও নেই স্মৃতিফলক, কোথাও নেই শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের এই নির্মম ইতিহাস অজানাই থেকে যাচ্ছে।

গবেষক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংগঠনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একাত্তরের গণহত্যা, বধ্যভূমি ও নির্যাতন কেন্দ্রগুলো দ্রুত সংরক্ষণ এবং যথাযথভাবে চিহ্নিত করা জরুরি। তা না হলে ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তারা মনে করেন, স্বাধীনতার চেতনা ধারণ করতে হলে এসব স্মৃতিকে সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়