আশায় আছেন কালাম-সাখাওয়াত-বাবুল
নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনে বিএনপি মাসুদুজ্জামান মাসুদকে প্রার্থী ঘোষণা করলেও মনোনয়ন-বঞ্চিত তিনজন নেতা এখনো আশায় আছেন এ প্রার্থী পরিবর্তনের। তাদের দাবি, দল প্রাথমিকভাবে সারাদেশে প্রার্থী ঘোষণা করেছেন, এই প্রার্থী তালিকা পরিবর্তন হতে পারে। এ প্রত্যাশায় নিয়মিত দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রচারণায় চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে দলের তৃণমূলের নেতারা বলছেন, বিএনপি ইতোমধ্যে আসনটিতে প্রার্থী চূড়ান্ত করে ফেলেছে। এ বিষয়টিকে আঁচ করতে পারছেন না মনোনয়ন-বঞ্চিতরা। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তারা প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন, যা তৃণমূলে দলকে বিভক্ত করছে। এই বিভক্তি দিনশেষে সুবিধা দিচ্ছে বিরোধী দলের প্রার্থীদের।
সদর ও বন্দর নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনটি এ জেলার গুরুত্বপূর্ণ আসন। এ আসনে বিএনপি মনোনয়ন চেয়েছিলেন অন্তত ১০ জন। তাদের মধ্যে বেশি আলোচনায় ছিলেন সাবেক যুবদল নেতা ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মাসুদুজ্জামান মাসুদ, সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কালাম, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান, সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু, মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ, বিএনপন্থী ব্যবসায়ী আবু জাফর আহমেদ বাবুল ও শিক্ষক আলিয়ার হোসেন।
তবে, আসনটিতে মনোনয়ন পান মাসুদুজ্জামান মাসুদ। নারায়ণগঞ্জে সমাজসেবা, ক্রীড়া ও শিক্ষাঙ্গণে ভূমিকা রাখা মাসুদুজ্জামান ব্যবসায়ী অঙ্গণেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। মডেল ডি ক্যাপিটালের এ কর্ণধার ছিলেন নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতিও। জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী মাসুদুজ্জামান গণঅভ্যুত্থানের পর নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশা করলে বিরোধীতার মুখে পড়েন দলটির শীর্ষ নেতাদের। তবে, তৃণমূলকে তিনি সংগঠিত করতে সক্ষম হন।
বিএনপি নেতারা বলছেন, দল তার বিগত দিনে বিএনপির প্রতি আনুগত্য ও দলীয় নেতা-কর্মীদের পাশে থাকার যে ভূমিকা, তা বিবেচনায় নারায়ণগঞ্জ-৫ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনটিতে মনোনীত করেছে। দলের সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নামেন মাকছুদুল আলম খোরশেদ, সমর্থন দেন আলিয়ার হোসেনও।
কিন্তু মনোনয়ন পাওয়ার পরও বিরোধীতা শেষ হয়নি। তার বিরুদ্ধে একজোট হন চার মনোনয়ন-প্রত্যাশীÑ সাখাওয়াত হোসেন খান, আবু আল ইউসুফ খান টিপু, আবুল কালাম ও আবু জাফর আহমেদ বাবুল। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন আবুল কালামের ছেলে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি আবুল কাউসার আশা।
গত ৩ নভেম্বর দল মাসুদুজ্জামানকে প্রার্থী ঘোষণার পর তাদের বিরোধিতা আরও তীব্র হয়। গত ১৫ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে সাখাওয়াত, কালাম, টিপু, আবুল কাউসার আশা এবং আবু জাফর বাবুল অভিযোগ করেন, “মাসুদুজ্জামান কখনো বিএনপি করেননি। গত ১৫ বছরে তিনি সরকারঘনিষ্ঠ সুবিধা পেয়েছেন। বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামেও ছিলেন না। আমরা চাই, ধানের শীষ এমন কাউকে দেওয়া হোক, যিনি অন্তত গত ১৫ বছর দল করেছেন।”
এ দাবিতে তারা নিয়মিত কর্মসূচি পালন করেন এবং তৃণমূলে সমর্থন গড়ে তোলার চেষ্টা চালান। কিন্তু পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত তাদের অনুকূলে আসেনি। উল্টো তৃণমূল নেতাকর্মীরা দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে দাঁড়াতে শুরু করেন। মাসুদুজ্জামানের কর্মসূচিগুলোতে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণও বাড়তে থাকে।
তৃণমূলের ভাষ্য, সাখাওয়াত-কালাম-টিপু-আশা-বাবুলরা দলের প্রার্থীকে অস্বীকার করে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন।
অন্যদিকে মাসুদুজ্জামান বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নিয়ে বরং সহনশীল আচরণ করেন। বিভক্ত নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন তিনি। সেই প্রচেষ্টার প্রতিফলন দেখা যায় ২৭ নভেম্বর মহানগর বিএনপির জনসভায়, যেখানে প্রায় সব সিনিয়র নেতা উপস্থিত ছিলেন।
সবচেয়ে বড় চমক ছিলেন মনোনয়ন বঞ্চিত সদস্যসচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু, যিনি সেদিন প্রকাশ্যে মাসুদুজ্জামানের প্রতি সমর্থন জানান। তিনি দু’দিন আগেও ছিলেন কালাম-সাখাওয়াত-বাবুল বলয়ে।
টিপুর অবস্থান বদলে যাওয়ায় বাকি চার নেতার ওপর চাপ বাড়ে। তাদের বিরুদ্ধে সমালোচনা তীব্র হয় বিভিন্ন পর্যায়ে। তারই প্রতিক্রিয়ায় গত ২৮ নভেম্বর বন্দরে পাল্টা জনসভা আয়োজন করেন তারা। সেখানে সাখাওয়াত অভিযোগ করেন, “দল এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। প্রাথমিক সিদ্ধান্ত আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা অপেক্ষা করতে পারি, কিন্তু সেই অপেক্ষাকেও অবজ্ঞা করা হচ্ছে।”
এদিকে প্রশ্ন উঠছে, যখন জেলার বেশিরভাগ বিএনপি নেতা-কর্মী ও সাধারণ ভোটার মনোনীত প্রার্থীকে গ্রহণ করেছে, তখন বঞ্চিতদের এতটাই অনমনীয় থাকার কারণ কী? দলীয় নেতাদের অনেকেই মনে করছেন, এ বিরোধিতার পেছনে ব্যবসায়ী আবু জাফর বাবুলের ইন্ধন রয়েছে। তার নেতৃত্বেই অপর নেতারা একজোট হয়েছেন দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে।
টিপুর হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন বঞ্চিতদের শক্তিকে চোখে পড়ার মতো দুর্বল করেছে। দীর্ঘদিনের সংগঠক ও প্রভাবশালী নেতা হিসেবে তার দলীয় প্রার্থীর পাশে দাঁড়ানো তৃণমূলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেÑ দল শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধভাবেই মাঠে থাকবে। এই অবস্থান কেবল মনোনীত প্রার্থীর অবস্থানকে আরও মজবুত করেছে না, বরং বিরোধীদের প্রচারণাকেও অনেকটা নিঃশব্দ করে দিয়েছে।
তবুও সাখাওয়াত, কালাম, বাবুলদের আশা কিন্তু পুরোপুরি নিভে যায়নি। তারা এখনো বিশ্বাস করছেন, প্রার্থী পরিবর্তনের সুযোগ থাকতে পারে। সেই বিশ্বাস থেকেই তাদের ক্ষীণ হলেও প্রচেষ্টা চলছে।
তবে তৃণমূল বিএনপির মতে, এই আশা আর কোনো বাস্তব সমর্থন খুঁজে পাবে না। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত কার্যত হয়ে গেছে চূড়ান্ত, আর মাঠের বাস্তবতাও এখন মাসুদুজ্জামানের দিকেই ঝুঁকে আছে। তাদের ভাষায়Ñ “বঞ্চিতদের আশা শেষ পর্যন্ত অপূর্ণই থাকবে।”





































